বাংলার গ্রামাঞ্চলের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক সম্পদে বহু পেশা, ধর্ম, বর্ণ ও জাতিগোষ্ঠীর মানুষের গভীর সম্পর্ক বিদ্যমান। এগুলো যুগ যুগ ধরে চলে আসছে বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক উৎসব ও পার্বনে। বাইরের দাপটে তাদের হাতে তৈরি পাত্র, পরিচ্ছদ ও অন্যান্য তৈজসপত্রের চাহিদা কমে যাওয়ায় এই ঐতিহ্য ধীরে ধীরে লুপ্তির পথে। মূলত, পারিবারিক এই পেশা তাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশ হলেও আধুনিক পোশাক, প্লাস্টিক ও খরচের কারণে অনেক পরিবার তাদের প্রাচীন পেশা বজায় রাখতে হিমশিম খাচ্ছে। পহেলা বৈশাখের মতো বড় উৎসবে পালপাড়ার কারিগররা চাইলে তাদের তৈরী জিনিসপত্রের নিত্যনতুন শৌখিন সামগ্রী বিক্রি করতে পারতেন, কিন্তু বর্তমানে তাদের ভাগ্য এতোটুকুও বদলায়নি। গত কয়েক বছর ধরেই তাদের পেশার জৌলুস হারাতে শুরু করেছে বলে জানা গেছে। মধুপুরের জলছত্র পালপাড়ায় গিয়ে ওই এলাকার কুমারদের সঙ্গে কথা বলে এ তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে।
টাঙ্গাইলের মধুপুর থেকে ৫-৬ কিলোমিটার দূরে বেরিবাইদ ও অরণখোলা ইউনিয়নের জলছত্র গ্রামে প্রায় ২৪-২৫ পরিবার কুমারী পেশায় যুক্ত। তারা টাঙ্গাইল-ময়মনসিংহ মহাসড়কের কাছে আনারস বাজারের পাশে বসবাস করে দুই-তিন যুগ ধরে। এই পেশার ঐতিহ্য অনুযায়ী, তারপাশাপাশি তারা বিভিন্ন বিল ও স্থানীয় জলাশয় থেকে মাটি সংগ্রহ করে টেকসই পাত্র, হাঁড়ি, কলসি, পটসহ নানান ধরনের মাটির তৈজসপত্র তৈরি করে আসছেন। তবে সময়ের পরিবর্তনে তাদের জন্য সেই চাহিদার পরিধিও কমে গেছে। আগে তাদের তৈরি মাটির বাস্তুতত্ত্বপূর্ণ চোখে দেখতেন গ্রামবাসীরা, এখন প্লাস্টিকের আধিপত্যে সেই চেহারা বিনষ্ট হয়েছে। বর্তমানে তারা শুধুমাত্র জীবিকা ও বংশপরম্পরায় চালিয়ে যাওয়ার জন্য এই পেশায় এগিয়েছে।
উৎসাহ হারানো কারিগর দের একজন সুদেব পাল (৩৫) বলেন, আগে যেখানে ২০০-৩০০ টাকায় মাটি কিনে তৈরি করতেন, সেখানে এখন অনেক বেশি খরচ হয়। বিক্রিও কম। একদিনে আয়ও কমে গেছে। ফলে পরিবারের পোষানোর জন্য এখন তাদের হিমশিম খেতে হয়। অন্যদিকে, পারুল রানী পাল (৩৫) জানান, তারা অনেকের কাছ থেকে ঋণ নিয়েছেন, তাই এখন তারা শুধু দইয়ের পাতিল ও অন্যান্য সহজপণ্য তৈরি করে কাস্টমাররা অর্ডার করলে তা শেষ করতে পারেন। তারাও এখন শুধুই পূর্বপুরুষের পেশা ধরে রাখতে চেষ্টা করছেন।
সুমতি রানী পাল (৬০) বললেন, নতুন প্রজন্মের কেউ এই পেশায় আসতে চায় না। যারা পুরোনো এই পেশায় ছিলেন, তারা এখন কম থাকেন। পাশাপাশি বাজারে প্লাস্টিকের চাহিদা বাড়ায় এই ঐতিহ্য হারিয়ে যেতে চলেছে। আরতি রানী পাল (৫৯) জানালেন, তারা বংশগত এই পেশা ধরে রেখেছেন, কিন্তু এখনকার বাজারে গতানুগতিক কাজের মান ও চাহিদা খুব কম। অনেকেরই এনজিও থেকে ঋণ নিতে হয়েছে, সেই কিস্তি নিজেরা দীর্ঘদিন দিয়ে যাচ্ছেন। তবে তাদের পেশার মধ্যে কোনো উন্নয়নের রেখাও দেখা যাচ্ছে না।
তুলসী রানী পাল বলেন, এই গ্রামে কুমার পরিবার অনেকটাই গরিব, তাদের শিক্ষার মানও খুব বেশি উন্নত নয়। তবে তারা আশাবাদী, সরকারী বা বেসরকারি সাহায্য পেলে তাদের এই ঐতিহ্যটিকে ধরে রাখতে এবং আধুনিক প্রযুক্তি সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগিয়ে যেতে পারবে। বিশেষ করে প্রশিক্ষণ ও বাজারজাতকরণে সহায়তা পেলে এই পেশাের জীবন ধারা বাৎসরিক দৃষ্টিতে আরও এগিয়ে যাবে বলে তারা মনে করেন।





