সোমবার, ১২ই জানুয়ারি, ২০২৬, ২৮শে পৌষ, ১৪৩২

নাফ নদে আরাকান আর্মির দাপটের কারণে টেকনাফ স্থলবন্দর প্রায় অচল, রাজস্ব হতাশা ৫০০ কোটি টাকা

মিয়ানমারে দীর্ঘস্থায়ী গৃহযুদ্ধের প্রভাব বাংলাদেশের সীমান্ত বাণিজ্যকে এক গভীর সংকটের মুখে ফেলেছে। বিশেষ করে টেকনাফ স্থলবন্দর গত নয় মাস ধরে সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হয়ে গেছে, যার ফলে দেশের রাজস্ব আয় ব্যাপকভাবে কমে গেছে। বাংলাদেশের সঙ্গে মিয়ানমার সীমান্তে অবস্থিত এই গুরুত্বপূর্ণ বন্দরটি এখন কার্যত অচল হয়ে পড়েছে কারণ নাফ নদে মিয়ানমারের আরাকান আর্মি (এএ) ব্যাপক দাপট দেখাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে পণ্যবাহী নৌযান চলাচল অনেকটাই বন্ধ হয়ে গেছে, যা দেশের রাজস্ব দপ্তরকে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে ফেলেছে। সংশ্লিষ্ট জরিপে জানা যায়, এই এক বছরগুলোতে সরকার প্রায় ৪০০ থেকে ৫০০ কোটি টাকা রাজস্ব আয় থেকে বঞ্চিত হয়েছে। সীমান্তের বিভিন্ন সূত্র জানাচ্ছে, রাখাইন রাজ্যের প্রায় ২৭০ কিলোমিটার এলাকা এখন আর্মির নিয়ন্ত্রণে, আর নাফ নদে পণ্য পরিবহন ও বাণিজ্য বন্ধ থাকায় সীমান্তের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কও ব্যাহত হচ্ছে। চলতি বছর ১২ এপ্রিল মংডু থেকে পণ্যবাহী একটি বোট টেকনাফের বন্দরে পৌঁছানোর পর থেকে আর কোনও বড় চালান আসেনি।

বর্তমানে স্থলবন্দরটির চিত্র ভয়াবহ। এক সময়ের ব্যস্ত এই এলাকা এখন প্রায় জনমানবহীন। ট্রাক, শ্রমিক, ব্যবসায়ীরা স্থান ত্যাগ করে এখানকার স্থান এখন তালাবন্ধ গুদাম, খালি ঘাটের আধারে পরিণত হয়েছে। বন্দরের নিরাপত্তারক্ষীরাও অনেকটা অলস সময় পার করছেন, লোকসংখ্যা কমে গেছে। ইউনাইটেড ল্যান্ড পোর্ট লিমিটেডের তথ্যমতে, প্রতি মাসে তারা প্রায় ৩০ লাখ টাকা লোকসান গুনছেন, আর নয় মাসে ক্ষতির পরিমাণ ছড়িয়ে ৩ কোটি টাকার বেশি। এ ছাড়াও, আমদানি-রপ্তানি বন্ধ থাকায় অনেক পচনশীল পণ্য গুদামগুলিতে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, যা ব্যবসায়ীদের প্রায় ১৫ কোটি টাকার ক্ষতি করছে। এজন্য অনেক ব্যবসায়ী ও সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট বিকল্প হিসেবে চট্টগ্রাম বন্দরে স্থানান্তর করার সিদ্ধান্ত নিয়ে নিচ্ছেন।

এই বাণিজ্য সংকটের কারণে স্থানীয় অর্থনীতিতে মারাত্মক ধাক্কা লেগেছে। অন্তত ১০ হাজার মানুষ সরাসরি কর্মহীন হয়ে পড়েছেন, এর মধ্যে দুই হাজার শ্রমিকের নাম রয়েছে নিবন্ধিত শ্রমিক হিসেবে। ট্রাকচালক, হেল্পার, ছোট ব্যবসায়ীরাও মানবেতর জীবনযাপন করছে। শ্রমিক নেতারা বলছেন, এই বন্দর ছিল টেকনাফ অঞ্চলের জীবিকা কেন্দ্র, যা এখন বন্ধ থাকায় পরিবারগুলো চরম কষ্টে দিন পার করছে। কক্সবাজার চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি সহ স্থানীয় ব্যবসায়ীরা দ্রুত কূটনৈতিক উদ্যোগের মাধ্যমে বাণিজ্য পুনরায় চালুর দাবিতে সোচ্চার হয়েছেন। তারা মনে করেন, মিয়ানমারের অস্থিতিশীল পরিস্থিতি ও সীমান্তে চলছে উত্তেজনা মোকাবিলা করে পণ্য আন্তর্জাতিক মানে ফিরিয়ে আনা ও সীমান্ত-ব্যবসা স্বাভাবিক করতে সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে কার্যকর হস্তক্ষেপ প্রয়োজন। বর্তমানে কাস্টমস এবং ব্যবসায়ী মহল ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর উদ্বেগে দিন কাটাচ্ছেন।

পোস্টটি শেয়ার করুন