বুধবার, ২১শে জানুয়ারি, ২০২৬, ৭ই মাঘ, ১৪৩২

রোজায় আবারও ভোগাবে আমদানিনির্ভর পাঁচ প্রয়োজনীয় পণ্য

শবে বরাত ও রমজান মাসের ঘোরে ফিরে এসেছে। আগামী ৪ ফেব্রুয়ারি পবিত্র শবে বরাত এবং ১৭ ফেব্রুয়ারি রোজার শুরু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এ হিসাবে শবে বরাত আসতে বাকি রয়েছে মাত্র ১৭ দিন, আর রোজার জন্য অপেক্ষা করতে হবে পুরো এক মাস। প্রতি বছর এ সময়ের জন্য সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে ভোগ্যপণ্য আমদানি ও মজুদের পরিকল্পনা নেওয়া হয়, এবারও এর ব্যতিক্রম হয়নি। গত চার থেকে পাঁচ মাস ধরেই এসব পণ্যের মজুদের প্রস্তুতি চলছে। ইতোমধ্যে অনেক পণ্য চট্টগ্রাম বন্দরে এসে পৌঁছেছে, আবার কিছু পণ্য এখনো পাইপলাইনে রয়েছে। তবে রোজার আগে ভোক্তাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এই সময়ের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে ব্যবসায়ীরা। তারা বিশেষ করে ভোজ্য তেল, চিনি, পেঁয়াজ, খেজুর এবং সবজি—এই cinq ধরনের প্রয়োজনীয় পণ্য নিয়েই মূলত আগাম প্রস্তুতি নিচ্ছেন। উল্লেখ্য, এই চার পণ্যই বেশির ভাগই আমদানির ওপর নির্ভরশীল।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, শেষ চার-পাঁচ মাসে পেঁয়াজের আমদানিতে কিছুটা কমতির দেখা গেলেও ভোজ্য তেল, চিনি এবং খেজুরের আমদানি বেড়েছে এবং মজুদ যথেষ্ট পরিমাণে রয়েছে। তবুও বাজারের পরিস্থিতি বিবেচনায় এসব পণ্যের দাম রোজার আগে বৃদ্ধি পাবে বলে ধারণা করছেন বাজার বিশ্লেষকরা। এর পাশাপাশি মুরগি, মাছ, গরুর মাংস, ছোলা ও বেসনের দামেও অস্বাভাবিক বৃদ্ধি দেখা যেতে পারে। ব্যবসায়ীরা মনে করছেন, এই সময়টি বিভিন্ন প্রভাবের কারণে দাম বাড়ার প্রবণতা সাধারণত বেশি থাকে।

বিশ্লেষকরা আরও বলছেন, বড় উৎসব বা উপলক্ষ এলেই ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট করে পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেন, যা ভোগান্তি বাড়ায় ভোক্তাদের। ক্যাবের সহ-সভাপতি এসএম নাজের হোসেন বলেন, “আমাদের দেশের ভোগ্যপণ্যের ব্যবসায়ী দল সততার বদলে বেশি মুনাফার জন্য সবসময় অপেক্ষায় থাকেন। রোজার দিকে তাকিয়ে তারা বছরের অন্য সময়ের তুলনায় বেশ বেশি লাভের আশা করেন। এবারের বাজার পরিস্থিতি হয়তো আরও খারাপ হতে পারে, কারণ সামনে আসছে নির্বাচন, যেখানে সরকারের নজর এখন নির্বাচনে distracted। ফলে বাজারের নিয়ন্ত্রণের দিকেও মনোযোগ নেই। এই পরিস্থিতিতে দেশের সাধারণ মানুষকে রোজায় আরও বেশি কষ্টে থাকতে হতে পারে।”

তিনি আরও যোগ করেন, “বর্তমান সরকারের দুর্বল বাজার নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা চালু আছে, যা পূর্বের মতোই। পণ্যের সরবরাহের পর্যাপ্ত তথ্য সরকারের কাছে না থাকায় বাজারে অস্থিরতা দেখা দিচ্ছে। যেমন, গরুর মাংসের দাম শবে বরাতের আগে প্রায় স্থিতিশীল থাকলেও এই সময় বেড়ে যেতে পারে। বর্তমানে গরুর মাংসের দাম কেজিতে ৭৫০ থেকে ৭৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, তবে এই দামে শবে বরাতের আগে তা ৮৫০ টাকা পর্যন্ত উঠতে পারে—এটি নিশ্চয়তা দিয়ে বলা সম্ভব নয়। তাই, সরকারের উচিত নির্বাচন পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি বাজার নিয়ন্ত্রণের দিকে নজর দেওয়া।

অন্যদিকে, এনবিআর ও চট্টগ্রাম বন্দর তথ্য বলছে, এ বছর আমদানিনির্ভর পণ্যের পাশাপাশি বেশ কিছু পণ্য আরও দ্রুত ও বেশি পরিমাণে আমদানি হচ্ছে। গত বছরের প্রথম ছয় মাসের চেয়ে এবছর অবস্থা ভালো। বিশেষ করে সয়াবিন তেল, চিনি, মসুর ডাল, ছোলা, মটর ডাল ও খেজুরের এলসি খোলার হার বেড়েছে। গত সেপ্টেম্বর-অক্টোবর সময়ের মধ্যে এ পণ্যগুলোতে আমদানি বেড়েছে যথাক্রমে ৩৬%, ১১%, ৮৭%, ২৭%, ২৯৪% ও ২৩১%। বড় ব্যবসায়ীরা বিশেষ করে মনোযোগ দিচ্ছেন ভোজ্যতেল ও চিনি আমদানিতে, কারণ দেশের চাহিদার বড় অংশই আমদানির ওপর নির্ভরশীল।

অন্যদিকে, পেঁয়াজ, রসুন, আদা, ডাল ও ছোলার মতো পণ্য আমদানিতে দরকারি এলসি খোলা হচ্ছে বড় বড় বাণিজ্যিক গ্রুপ ও ব্যবসায়ীদের উদ্যোগে। দেশের চাহিদার মাত্র ২০-৩০% অর্থাৎ বেশিরভাগই আসে আমদানির মাধ্যমে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসেব বলছে, সেপ্টেম্বরে এলসি খোলার পরিমাণ ছিল প্রায় ৬.২৯ বিলিয়ন ডলার, আর অক্টোবরের মধ্যে আরো ৫.৬৪ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে সয়াবিন তেল, চিনি, ডাল, ছোলা ও খেজুরের আমদানির অঙ্ক সাবলীলভাবে বেড়েছে, যা গত বছরের তুলনায় ভালো।

বিশ্লেষকরা বলছেন, এই পরিস্থিতিতে কিছু বড় শিল্প প্রতিষ্ঠান ও আমদানিকারকরা আগেভাগেই এলসি খুলে রেখেছেন প্রয়োজনীয় পণ্যসমূহের জন্য, কারণ রমজানে চাহিদা অনেক বেড়ে যায়। তবে দ্রব্যমূল্যের এই বাড়তি চাপের জন্য মূল কারণ হলো ডলারের দাম ও পরিবহন খরচ বৃদ্ধি, যা আমদানির খরচ আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।

অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করে বলছেন, দেশের বাজারে পর্যাপ্ত তথ্যের অভাবে নিয়ন্ত্রন কঠিন হচ্ছে। তারা মনে করেন, দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা আনতে ডিজিটাল সাপ্লাই চেইন তৈরি করতে হবে। নেতৃত্বে আসা কোনো কার্যকর পদক্ষেপ এখনও বাস্তবায়িত হয়নি, যা বাজারের স্থিতিশীলতা ও ভোক্তার স্বার্থের জন্য জরুরি।

পোস্টটি শেয়ার করুন