শুক্রবার, ২৩শে জানুয়ারি, ২০২৬, ৯ই মাঘ, ১৪৩২

বেহেস্ত-দোজখের টিকেট বিক্রেতারা ভোটের আগে মানুষকে ঠকাচ্ছে

দিল্লি, পিন্ডি বা অন্য কোনো দেশের কথা না ভেঙে, বাংলাদেশকেই আগে ঘোষণা করে নির্বাচনী প্রচার শুরু করেছেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, যেখানে দিল্লি বা অন্য কোনো দেশের কথা উঠে, সেখানে তাঁর মূল বার্তা হচ্ছে—সবচেয়ে আগে আমাদের প্রিয় বাংলাদেশ। তিনি স্পষ্ট করে উল্লেখ করেন, দেশের মানুষই হচ্ছে আমাদের সকল রাজনৈতিক ক্ষমতার মূল উৎস। সেই কারণেই আমরা দেশের মানুষের ভাগ্যোন্নয়নে অঙ্গীকারবদ্ধ।

সিলেট নগরীর সরকারি আলিয়া মাদ্রাসা মাঠে বৃহস্পতিবার (২২ জানুয়ারি) অনুষ্ঠিত এই প্রথম নির্বাচনী জনসভায় তিনি দেশবাসীর সহযোগিতা এবং দোয়া কামনা করেন। তিনি ধানের শীষকে বিজয় করার জন্য সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করার আহ্বান জানান।

তারেক রহমান বলেন, সবকিছুর মালিক একমাত্র আল্লাহ। কিন্তু নির্বাচনের আগে একটি দলের পক্ষ থেকে ইসলামের নাম ভাঙিয়ে, বেহেস্ত ও দোজখের টিকেট বিক্রির অপপ্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। তারা ক্ষমতায় আসার আগেই মানুষের់ ঠকানোর এই নীলনকশা চালাচ্ছে।

তিনি বলেন, ‘কারো কেউ বলে, তমুককে দেখেছি, কিন্তু এখন আসুন, একে দেখুন। ১৯৭১ সালে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সময় লক্ষ লক্ষ জীবন উৎসর্গ করেছেন যারা, তাদের ভূমিকা আমরা প্রত্যক্ষ করেছি। যারা এই দেশের জন্য জীবন দিয়েছেন, তাদের সম্মান ধরে রাখতে হবে। এদেশের মা-বোনেরা যেমন গর্ব করে, তেমনি বাংলার হার না মানা মানুষেরা দেশের স্বাধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য লড়াই করে চলেছেন।’

বিএনপি সমর্থকদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, দেশের প্রত্যেক নাগরিককে স্বাবলম্বী করে তুলতে হবে। কেবল ভোট এবং বক্তৃতার মাধ্যমে নয়, বরং বাস্তবে মানুষকে স্বনির্ভর করে তুলতেই হবে। সেই সঙ্গে তিনি বলেন, রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তনের লক্ষ্যে আমাদের ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে, প্রতিহিংসা ও মিথ্যার বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হবে।

বক্তব্যের এক পর্যায়ে তিনি প্রশ্ন করেন, ‘কাবা শরিফের মালিক কে? এই পৃথিবীর মালিক কে? সূর্য, তারা, বেহেশত ও দোজখের মালিক কারা?’ সবাই একসঙ্গে ‘আল্লাহ’ উত্তর দেয়। এরপর তিনি বলেন, ‘আপনাদের সাক্ষ্য, পৃথিবীর, বেহেস্তের, কাবার মালিক আল্লাহ। তাহলে কি অন্য কেউ এসব দেবের মালিক হতে পারে? যারা বলে, টিকেট দেব, দেব, বলে যে দল বলছে, তারা কি শিরক করছে না?’

তিনি আরও বলেন, ‘প্রথম থেকেই এসব দল মানুষকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছে। মনে রাখবেন, আল্লাহর ছাড়া অন্য কারো জন্য এই কিছুর মালিক হওয়ার ক্ষমতা নেই। তাহলে এখনই বুঝতে হবে, ভোটের সময় যারা আপনাদের ঠকাচ্ছে, পরের ধাপে কেমন ঠকাতে পারে।’

আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের নির্বাচনী পরিস্থিতি নিয়ে তারেক রহমান বলেন, ‘পঁয়ত্রিশ বছর ধরে দেখা গেছে, কীভাবে ভোটের দিন রাতে ব্যালটবাক্স ছিনতাই হয়েছে, কখনো কখনো ভোটের নাম করে গণতন্ত্রকে ক্ষতবিক্ষত করা হয়েছে। অস্থিরতার মাধ্যমে ভোটারদের অধিকার হরণ করা হয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘গত ১৫-১৬ বছরে উন্নয়নের নামে দেশের সম্পদ লুটপাট, বিদেশে পাচার, আর্থিক দুর্নীতি ও দুর্বিনীতির গল্প সবাই জানি। এসবের মাধ্যমে দেশের স্বার্থের ক্ষতি করা হয়েছে।’

বেলা ১০টা ৫০ মিনিটে কোরআন তিলাওয়াতের মাধ্যমে জনসভা শুরু হয়। সিলেট জেলা ও মহানগর বিএনপি এবং সুনামগঞ্জ জেলার উদ্যোগে এই সমাবেশে তারেক রহমান উপস্থিত হন দুপুর ১২টা ২৫ মিনিটে এবং প্রায় অর্ধ ঘণ্টা বক্তব্য দেন। এর আগে, তিনি শহরতলীর বিমানবন্দর এলাকায় গ্র্যান্ড সিলেট হোটেল ও রিসোর্টে তরুণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন।

জনসভায় সভাপতিত্ব করেন সিলেট জেলা বিএনপির সভাপতি আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী। এছাড়া, মঞ্চে বিভিন্ন জেলা থেকে নির্বাচিত বিএনপি মনোনীত প্রার্থী ও নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। বক্তব্যের সূচনালগ্নে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বিশেষ অতিথির বক্তব্য দেন। সেই সঙ্গে, তারেক রহমানের স্ত্রী জুবাইদা রহমানসহ কেন্দ্রের নেতাকর্মীরাও উপস্থিত ছিলেন।

জনসভা ঘিরে বিভিন্ন দলীয় নেতা-কর্মী বিভিন্ন আঞ্চলিক মিছিল নিয়ে সভাস্থলে উপস্থিত হন; তারা উজ্জ্বলভাবে ধানের শীষ, বিএনপি, জিয়াউর রহমান, খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের সংগীতসমৃদ্ধ স্লোগান দেন। অনেকেই ধানের শীষের ছবি থাকা টুপি ও দলের পতাকা কপালে বেঁধে সভায় উপস্থিত হন। বাইরে থেকে ব্যবসায়ীরা প্লাস্টিকের ধানের শীষ কিনে আনিয়ে সভায় যোগ দেন।

অনুসঙ্গ বিচারে আজকের সভায় ‘গুম হওয়া’ বিএনপির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক ইলিয়াস আলীর নাম তীব্রভাবে উঠে আসে। ২০১২ সালের ১৭ এপ্রিল ঢাকা বনানী থেকে নজরদারীতে গুম হওয়া এই নেতা বিভিন্ন নামে পরিচিত থাকলেও এখনো নিখোঁজ রয়েছেন। তারেক রহমান ও অন্যান্য বক্তারা ইলিয়াস আলীসহ অন্যান্য নিখোঁজ নেতাদের নাম উল্লেখ করে শোক প্রকাশ করেন।

সভায় আরও অনেক সংগঠক ও নেতাকর্মী গুম ও শহীদ পরিবারের সঙ্গে সংহতির জন্য নির্ধারিত স্থানগুলোতে বসে থাকেন।

জনসভা শেষে তারেক রহমান সড়ক পথে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হন। পথে তিনি ছয়টি জেলা—মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কিশোরগঞ্জ, নরসিংদী ও নারায়ণগঞ্জ—উপস্থিত স্থানগুলোতে ভাষণ দেন। এসব সভায় তিনি বিএনপি-সমর্থিত প্রার্থী ও নেতা-কর্মীদের পরিচয় করিয়ে দেন, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করেন।

পোস্টটি শেয়ার করুন