মিয়ানমারে সামরিক জান্তার সমর্থিত বিতর্কিত জাতীয় নির্বাচন চলাকালে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ভয়াবহ বিমান হামলার ঘটনা ঘটেছে, যার ফলে কমপক্ষে ১৭০ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। ২০২১ সালে অভ্যুত্থানের মাধ্যমে সাধারণ বেসামরিক সরকারকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেওয়া পর থেকে এই প্রথম এত বড় ধরনের হামলা ও সহিংসতা দেখা গেল। নির্বাচনের সময় এই হামলা ও সহিংসতা আরও চরম আকার ধারণ করে।
জাতিসংঘের মানবাধিকার হাইকমিশন এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, ২০২১ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৪ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত তিন দফায় চলা এই নির্বাচনের সময়কাল জুড়ে দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে অন্তত ৫০৮টি বিমান হামলা কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে। এই হামলায় সাধারণ জনগণের পাশাপাশি বেশ কয়েকজন প্রার্থীও প্রাণ হারিয়েছেন। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এই নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে অনেকেই ‘সাজানো নাটক’ হিসেবে অভিহিত করেছেন, কারণ এটি শুধু সামরিক বাহিনীর মঞ্চে একতরফা উপস্থাপনা বলে মনে করা হয়।
নির্বাচন কমিশনের ঘোষণা অনুযায়ী, ২৫ জানুয়ারি ভোট গ্রহণ শেষ হয়, তবে যেসব এলাকায় ভোটনির্বাচন আদতে অনুষ্ঠিত হয়নি, সেখানে নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণা হয়নি। তবে জান্তা সমর্থিত দল ইউনিয়ন অ্যান্ড সলিডারিটি পার্টি (ইউএসডিপি) বলছে, তারা এরকম নির্বাচন দিয়ে একচ্ছত্র প্রাধান্য প্রতিষ্ঠা করেছে। কিন্তু এই নির্বাচনকে আন্তর্জাতিক মহলে খুবই নিন্দিত এবং অবৈধ বলে মনে করা হচ্ছে।
জাতিসংঘের মানবাধিকার সংস্থার একজন কর্মকর্তার মতে, এই বিমান অভিযান ডিসেম্বরের মাঝামাঝি শুরু হয়ে জানুয়ারি পর্যন্ত অব্যাহত ছিল, যেখানে মূল লক্ষ্য ছিল বিরোধী ও বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর ওপর দমনপীড়ন চালানো। এই অভিযানের ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে ভয় এবং মানবিক সংকট বাড়ছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এই নির্বাচন ও তার ফলাফলের মাধ্যমে জান্তারা নিজেদের ক্ষমতা কায়েম করতে চাইছে; কিন্তু এই প্রহসন সত্যিকার গণতন্ত্রের অস্তিত্বকে প্রশ্নে রাখতে বাধ্য করবে। অধিকাংশ দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থা এই নির্বাচনের ফলাফল প্রত্যাখ্যান করেছে। বিশ্লেষকরা মনে করেন, এই ধারাবাহিক সহিংসতা ও বিমান হামলার মধ্যে দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠছে।
অপরদিকে, দীর্ঘ সময় ধরেই মিয়ানমারে জেনারেল মিন অং হ্লাইং এর নেতৃত্বে সামরিক শাসন চালু রয়েছে, যা ২০২১ সালের অভ্যুত্থানের পরে আরও তীব্রতর হয়েছে। গণতান্ত্রিক ভাবনা থেকে প্রত্যাখ্যাত এই ক্যু এবং সহিংসতা সাধারণ মানুষের জন্য জীবনে অস্থিরতা ও মানবিক সংকট তৈরি করছে। বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর সশস্ত্র প্রতিরোধ অব্যাহত থাকায় সামরিক বাহিনী অসহায় হয়ে পড়ছে। উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে হঠাৎ করেই নতুন করে বিমান হামলা চালাচ্ছে সেনাবাহিনী।
এই পরিস্থিতি জটিল করতে এক প্রতিবেদনে জানতে পাওয়া গেছে, ইরান প্রকাশ্য নয় এমন ‘ভুতুড়ে জাহাজে’ করে তেল ও অস্ত্র মিয়ানমারে পাঠাচ্ছে। মানবেন্স সংস্থাগুলোর মতে, এই পরিস্থিতিতে রাশিয়া, ইরান ও উত্তর কোরিয়ার কাছ থেকে সামরিক ও অস্ত্র সরবরাহের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এড়ানো হচ্ছে। বিশেষ করে, ২০২৪ সালে মিয়ানমারে এক হাজার ৭০০টির বেশি বিমান হামলার মাধ্যমে হাজার হাজার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
উপরন্তু, তদন্তে দেখা গেছে, ২০২৪ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত নতুন ধরনের বার বার জ্বালানি ও অস্ত্রের চালান অবিরত যাচ্ছে বলে মনে করা হয়। এমন অভিযান ও অব্যাহত সহিংসতা ভবিষ্যতে দেশের পরিস্থিতিকে আরও বেশি অস্থির করে তুলতে পারে, যেখানে সাধারণ মানুষের জীবন ও মানবাধিকার মারাত্মক হুমকির মুখে।





