মঙ্গলবার, ৩রা ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ২০শে মাঘ, ১৪৩২

চট্টগ্রাম বন্দর টানা তৃতীয় দিনেও অচল, অর্থনৈতিক অস্থিরতা বাড়ছে

চট্টগ্রাম বন্দরের গুরুত্বপূর্ণ নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) পরিচালনার দায়িত্ব বর্তমানে দুবাইভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ‘ডিপি ওয়ার্ল্ড’-এর কাছে হস্তান্তর করার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে চলছে ব্যাপক প্রতিরোধ। এই পরিস্থিতিতে দেশের অন্যতম এই অর্থনৈতিক কেন্দ্রের কার্যক্রম আরও স্থবির হয়ে পড়েছে, কারণ শ্রমিক-কর্মচারী ও বন্দর রক্ষা সংগ্রাম কমিটির ডাকা টানা তৃতীয় দিনের কর্মবিরতি আজ সোমবার (২ ফেব্রুয়ারি) সকাল ৮টার পর থেকে অব্যাহত থাকায় বন্দরের সকল কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেছে। গত শনিবার ও রবিবার একই সময়ে সফলভাবে কর্মবিরতি পালনের পর, শ্রমিকরা এখন আরও কঠোর অবস্থানে আছেন।

সামাজিক সূত্র ও স্থানীয় সরেজমিনে জানা গেছে, এই কর্মবিরতির কারণে জেটিতে অবস্থানরত জাহাজগুলো থেকে পণ্য খালাস এবং কনটেইনার লোডিং-অপারেশন পুরোপুরি বন্ধ। বন্দর ফটক থেকে কোনো ট্রাক বা কভার্ড ভ্যান পণ্য বণ্টন করতে পারছেন না, ফলে বন্দরের পাশে সড়কগুলোতে যানবাহন ও মালবোঝাই ট্রাকের সংখ্যা কমে গেছে। চট্টগ্রাম বন্দর বার্থ অপারেটর অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, জাহাজে কাজের জন্য শ্রমিক বুকিং দেওয়ার চেষ্টা করলেও তারা কাজের জন্য যোগ দিতে রাজি হচ্ছেন না। শুধু শ্রমিকরাই নয়, দপ্তরী ও কর্মচারীরাও কর্মবিরতিতে থাকায় প্রশাসনিক কাজ-প্রক্রিয়া যেমন কাগজপত্র আদান-প্রদান, অনুমোদনসহ অন্যান্য কাজও বন্ধ হয়ে গেছে।

আন্দোলনের মূল কারণ হিসেবে জানানো হয়েছে, বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার চট্টগ্রাম বন্দরের এককভাবে প্রায় ৪০ শতাংশ কনটেইনার হ্যান্ডলিং করার এই গুরুত্বপূর্ণ নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) বিদেশি কোম্পানির কাছে লিজ দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছে। শ্রমিক নেতারা মনে করেন, ২০০১ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সময় এই টার্মিনাল স্থাপন শুরু হয় এবং ২০০৭ সালে নিজস্ব অর্থায়নে এটি নির্মিত হয়। এখানে আধুনিক প্রযুক্তি ও দক্ষ কর্মীবৃত্ত রয়েছে, তাই তাদের দাবি, বিদেশি বিনিয়োগ বা পরিচালনার কোনও প্রয়োজন নেই। বরং, এটিকে বিদেশিদের কাছে হস্তান্তর করলে দেশের নিরাপত্তা ও অভ্যন্তরীণ রাজস্ব ক্ষতির ঝুঁকি দেখা দিতে পারে।

অপরদিকে, এই সংকট মোকাবেলায় চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। গত দুই দিনে আন্দোলনরত শ্রমিক ও কর্মচারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা হিসাবে কমপক্ষে ১৬ জনকে ঢাকার আইসিডি ও নারায়ণগঞ্জের পানগাঁও টার্মিনালে তৎক্ষණিক বদলি করা হয়। তবে এই বদলি আদেশ আন্দোলনকে আরও উস্কে দিয়েছে বলে শ্রমিক নেতা ও সংগঠনের পক্ষ থেকে অভিযোগ উঠেছে। আন্দোলনকারীরা বলে থাকেন, দাবি মেনে নেওয়া না হলে এবং অবৈধ বদলির আদেশ প্রত্যাহার না হলে তারা শান্তিপূর্ণভাবে বিক্ষোভ চালিয়ে যাবেন।

সতর্কতা হিসেবে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বন্দর ও আশপাশের এলাকা এক মাসের জন্য সকল সভা, সমাবেশ ও শোভাযাত্রা নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। পুলিশের এই সিদ্ধান্তের কারণ হিসেবে জননিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক গুরুত্বকে দেখানো হলেও, আন্দোলনকারী শ্রমিকরা কাজ বন্ধ রেখে ঘরে বসে প্রতিবাদ জানাচ্ছেন। এই দীর্ঘ অচলাবস্তার ফলে দেশের বৈশ্বিক বাণিজ্য ও ব্যবসায় বিশ্বমানের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হতে পারে এবং কোটি কোটি টাকার রাজস্ব ক্ষতির শঙ্কাও বেড়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা এই পরিস্থিতি দ্রুত সমাধানের জন্য সরকারের এবং শ্রমিক সংগঠনের সাথে আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

পোস্টটি শেয়ার করুন