শান্তিতে নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূসের মূল দর্শন ছিল ‘দারিদ্র্যকে জাদুঘরে পাঠানো’। তিনি এটিকে একটি চ্যালেঞ্জ মনে করে এর সমাধানে মত প্রকাশ করেছিলেন। তবে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারে প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে ১৮ মাসের দায়িত্বে থাকাকালীন সময়ে দেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতা তাঁর এই দর্শনের বিপরীত চিত্রই স্পষ্ট করে তুলেছে। ক্ষমতা গ্রহণের সময় যে জনসমর্থন ও সংস্কারের ম্যান্ডেট নিয়ে তিনি আগের সরকারকে প্রত্যাখ্যান করলেন, তার পরিপ্রেক্ষিতে দেখা যায়, তাঁর শাসনামলে দেশের প্রায় ৩০ লাখ মানুষ দারিদ্রসীমার নিচে চলে গেছেন। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, যখন তিনি রাষ্ট্রের কাঠামো পরিবর্তনের সুযোগ পান, তখন তার সদ্ব্যবহার করতে ব্যর্থ হয়েছেন। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধি তাঁর সফলতার একটি দেখানো হলেও, এর পেছনে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়া এবং উৎপাদন খাতের সংকোচন ছিল মূল কারণ, যার জন্য সমালোচনা উঠেছে।
ড. ইউনূসের ১৮ মাসের শাসনামলে অর্থনীতির সমস্ত সূচকই নিম্নমুখী। বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক আব্দুল বায়েস বলেন, একজন অর্থনীতিবিদ হিসেবে সরকার প্রধান হওয়ার পর প্রত্যাশা ছিল অর্থনীতি সুস্থ হয়ে উঠে, কিন্তু বাস্তবে ব্যবসায়িক আস্থা কমে গেছে এবং শিল্পের উৎপাদন ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে চলে গেছে। বিশ্বব্যাংকের তথ্যে দেখা গেছে, তাঁর সময়ে নতুন করে দরিদ্রের সংখ্যা বাড়েছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জুনের মধ্যে বেসরকারি বিনিয়োগ জিডিপির ২৪ শতাংশ থেকে ২০২৫ সালে কমে ২২ দশমিক ৪৮ শতাংশে এসে দাঁড়ানো, যা গত চার দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন। একই সময়ে সম্প্রতি বাস্তবায়িত এইডিপির হারও ছিল গত দশ বছরের মধ্যে সবচেয়ে কম। এছাড়াও, সরকারের ঋণের বোঝা এরই মধ্যে ২৩ লাখ কোটি টাকায় পৌঁছেছে, যা দেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যতের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করেছে।
ব্যাংকিং খাতের বিশৃঙ্খলা এই সময়ের অন্যতম কালো অধ্যায়। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরের মধ্যে দেশের খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৪৪ হাজার ৫১৫ কোটি টাকায়, যা মোট বিতরিত ঋণের প্রায় ৩৫.৭৩ শতাংশ। গবেষকদের মতে, এই হার বিশ্বে সবচেয়ে বেশি। সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা যখন কমছে, তখন মূল্যস্ফীতির হার সাড়ে ৮ শতাংশে থাকলেও মজুরির বৃদ্ধির হার ছিল কম—৮ এর নিচে। অর্থাৎ, মানুষের আয়ে বৃদ্ধির তুলনায় খরচ অনেক বেশি। বিদায়ী ভাষণে ড. ইউনূস ৩৪ বিলিয়ন ডলার রিজার্ভের পরিসংখ্যান দিয়ে স্বস্তি প্রকাশ করলেও, গবেষকেরা মনে করছেন, বিদ্যুৎ উৎপাদন কমানো এবং আমদানিকে কঠোরভাবে সংকুচিত করে এই রিজার্ভ বাড়ানো হয়েছে, যা কোন টেকসই সমাধান নয়।
এছাড়াও, তাঁর বিরুদ্ধে প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে নিজের স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে সুবিধা দেওয়ার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। তার শাসনামলে গ্রামীণ ব্যাংকের কর রাজস্ব মওকুফ করা হয়েছে, এবং সরকারের শেয়ার কমিয়ে ২৫ শতাংশ থেকে ১০ শতাংশে নামানো হয়েছে। তদ্ব্যতীত, গ্রামীণ ইউনিভার্সিটির অনুমোদন, গ্রামীণ জনশক্তি রপ্তানির লাইসেন্স, এবং গ্রামীণ টেলিকমের ডিজিটাল ওয়ালেট চালুর দ্রুত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, শ্রম আইন লঙ্ঘন এবং অর্থ পাচারের মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তি হওয়ায় বিচার বিভাগের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এই সময়ে তিনি গণমাধ্যমের বিভিন্ন প্রশ্নের সরাসরি উত্তর না দিয়ে নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি পরিপন্থী অনেক অভিযোগের মুখোমুখি হয়েছেন।
সবচেয়ে বেশি উদ্বেগের বিষয় ছিল, তাঁর আমলেই সৃষ্টি হয় বিখ্যাত ‘মব কালচার’, যেখানে বিভিন্ন গণমাধ্যম অফিসে অগ্নিসংযোগ, সাংবাদিকদের অবরুদ্ধ ও কারারুদ্ধের মতো ঘটনা ঘটেছে। ধর্মীয় উপাসনালয় ভাঙচুর, ধর্মের দোহাই দিয়ে হত্যাকাণ্ড, এমনকি দেশের ঐতিহ্য, মুক্তিযুদ্ধের নথিপত্র ও ভাস্কর্য বিনষ্টের ঘটনায় তিনি আনুষ্ঠানিক ভূমিকা না নিলেও অভিযোগ উঠেছে, তিনি নীরবতা পালন করেছেন। বিশ্ব মানচিত্রে তিনি ‘তিন শূন্য’ তত্ত্ব প্রচার করলেও, বাস্তবে দারিদ্র্য ও বেকারত্ব বৃদ্ধিই লক্ষ্য করা যাচ্ছে। অর্থমন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের মতে, এই অপ্রত্যাশিত ব্যর্থতা ও ঋণের বোঝা ১৮ মাসের এই শাসনামলের একটি দাগ হয়ে থাকবে, যা ভবিষ্যতের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।





