কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই এর ক্রমবর্ধমান প্রভাবের কারণে বিশ্বজুড়ে সেমিকন্ডাক্টর বা চিপ উৎপাদনের সরঞ্জাম খাতে নতুন ও চাঞ্চল্যকর পরিবর্তন দেখা দিয়েছে। দীর্ঘ তিন প্রান্তিকের মন্থর প্রবৃদ্ধির পর এখন শীর্ষ চিপ সরঞ্জাম নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলো নতুন অধ্যায়ের মুখ দেখছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকের অঙ্কিত হিসাব মতে, এই খাতের কোম্পানিগুলোর সম্মিলিত আয় গত বছরের সমান সময়ের তুলনায় প্রায় ১৬ শতাংশ বাড়তে পারে। বৈশ্বিক চিপ শিল্পের এই উর্ধ্বমুখী ধারাটির মূল কারণ হলো এআই প্রযুক্তির দ্রুত প্রসার, যা এই শিল্পে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে।
বিশ্লেষকদের তথ্য অনুযায়ী, জাপান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপভিত্তিক শীর্ষ নয়টি চিপ সরঞ্জাম সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান গত প্রান্তিকে যেখানে তাঁদের আয়ের বৃদ্ধির হার ছিল মাত্র ৮ শতাংশ, সেখানে চলতি প্রান্তিকে তা দ্বিগুণ হয়ে ১৬ শতাংশে পৌঁছানোর পথে। এই সময়ে এই কোম্পানিগুলোর সম্মিলিত নিট মুনাফাও ২০ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পাওয়ার প্রত্যাশা করা হচ্ছে, যা তাদের অষ্টম প্রান্তিকে এসে দুই অংকের প্রবৃদ্ধির রেকর্ড গড়ে দিয়েছে। বিশ্বমানের চিপ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান হিসেবে টিএসএমসি (তাইওয়ান সেমিকন্ডাক্টর) ইতিমধ্যেই ঘোষণা করেছে, ২০২৬ সালে তারা মূলধনী বিনিয়োগে নতুন উচ্চতায় পৌঁছাবে। একই সঙ্গে, দক্ষিণ কোরিয়ার টেক জায়ান্ট স্যামসাং ইলেকট্রনিকস এবং এসকে হাইনিক্সও তাদের উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে বিশাল পরিমাণে বিনিয়োগের পরিকল্পনা নিয়েছে।
এই দ্রুত প্রবৃদ্ধির পেছনের অন্যতম মূল চালিকা শক্তি হলো এআই সার্ভার তৈরির জন্য অপরিহার্য ‘ডিআরএএম’ মার্জিনিয় চিপের চাহিদা। চিপ প্রস্তুতকারক সংস্থাগুলি এই চাহিদা পূরণে অত্যন্ত তৎপর হয়ে উঠেছে। অনেক ক্ষেত্রে গ্রাহকেরা দীর্ঘ সময় নতুন কারখানা বা উৎপাদন লাইন চালুর অপেক্ষা না কর Tai, বরং বিদ্যমান সরঞ্জাম সংস্কার বা রক্ষণাবেক্ষণের মাধ্যমে কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। এই প্রবণতা জন্য টোকিও ইলেকট্রনের মতো সংস্থাগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ ও মেইনটেইনেন্স ব্যবসায় ব্যাপক সফলতা দেখা যাচ্ছে। পাশাপাশি, সিলিকন ওয়েফার তৈরির সূক্ষ্ম সার্কিট নকশায় ব্যবহৃত ‘ফ্রন্ট-এন্ড’ যন্ত্রপাতির বাজারও চলতি বছর ২০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধির প্রত্যাশা করছে।
বিশ্বের শীর্ষ প্রযুক্তি কোম্পানি এএসএমএল হোল্ডিং এই পরিস্থিতি নিয়ে যথেষ্ট আশাবাদী। তাদের প্রধান নির্বাহী ক্রিস্টোফ ফুঁয়েক জানিয়েছেন, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে বাজারের সামগ্রিক অবস্থা ইতিবাচক পরিবর্তনের দিকে গেছে এবং চলতি প্রান্তিকে তাদের আয়ের ১০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি দেখা যেতে পারে। বিশেষ করে, এআই অ্যাপ্লিকেশনের জন্য ব্যবহৃত ‘লজিক চিপ’ তৈরির যন্ত্রপাতির শক্তিশালী বাজার তাদের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দিয়েছে।
অন্যদিকে, বিশ্বে ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং যুক্তরাষ্ট্রের সাথে প্রযুক্তিগত চাপের মাঝেও, চীনের বাজারে চিপ তৈরির সরঞ্জামের বিক্রয় ধারাবাহিকভাবে বেড়ে চলেছে। সর্বশেষ রিপোর্টে দেখা গেছে, শীর্ষ আটটি চিপ সরঞ্জাম নির্মাতা প্রতিষ্ঠান তাদের মোট আয়ের প্রায় ৩০ শতাংশই আসে চীনের বাজার থেকে। বিশেষ করে, এএসএমএলের সরঞ্জামের বিক্রিতে চীনরে বৃদ্ধি ৬০ শতাংশেরও বেশি। বিশ্লেষকদের মতে, রফতানি নিষেধাজ্ঞা থাকলেও পুরোনো প্রজন্মের লিথোগ্রাফি সরঞ্জামগুলোর জন্য চীনে এই চাহিদা যথেষ্ট 높ে উঠেছে। এ ছাড়া, চিপ প্রসেসিং ও টেস্টিংয় ব্যবহৃত ‘ব্যাক-এন্ড’ সরঞ্জামের ক্ষেত্রে অ্যাডভান্টেস্ট ও ডিস্কোর মতো প্রতিষ্ঠানগুলোও চীনে তাদের ব্যবসা বিস্তার করছে। এই সবের সমন্বয়ে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জন্মে বিশ্ব চিপ সরঞ্জাম শিল্প নতুন ও লাভজনক উচ্চতায় পৌঁছে যাচ্ছে।





