ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে পশ্চিমা দেশগুলো রাশিয়ার বাজারকে বৈশ্বিক বাণিজ্য থেকে বিচ্ছিন্ন করার জন্য কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। তবে বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। বিশেষ করে অটোমোবাইল বা গাড়ি শিল্পে এই নিষেধাজ্ঞা কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়েছে চীনকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা বিশাল ‘গ্রে মার্কেট’ বা অনানুষ্ঠানিক বাণিজ্যপথের কারণে। বিশ্ববিখ্যাত ব্র্যান্ড যেমন টয়োটা, মাজদা, মার্সিডিজ-বেঞ্জ ও বিএমডব্লিউ’র গাড়িগুলো এখন সরাসরি রফতানি না করেও নিয়মিতভাবে চীনের মধ্যস্থতায় রাশিয়ার শোরুমগুলোতে প্রবেশ করছে। রয়টার্সের সাম্প্রতিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন এই ব্যাপারটিকে তুলে ধরেছে, যেখানে দেখা গেছে নিষেধাজ্ঞার বাধা অতিক্রম করে বিকল্প পথে রাশিয়ার অর্থনীতির চাকা সচল রাখা এই চাঞ্চল্যকর তথ্য।
বিশ্লেষণে দেখা গেছে, অটোমোবাইল গবেষণা প্রতিষ্ঠান অটোস্ট্যাটের তথ্য অনুযায়ী, পশ্চিমা ও জাপানি কোম্পানিগুলো রাশিয়ায় সরাসরি ব্যবসা বন্ধ করলেও দেশটিতে এসব ব্র্যান্ডের গাড়ির চাহিদা একটুও কমেনি। বরং রুশ ডিলাররা এখন সরাসরি প্রস্তুতকারককে না বলেই বড় চীনা ব্যবসায়ী নেটওয়ার্কের মাধ্যমে গাড়ি সংগ্রহ করে থাকছেন। এই প্রক্রিয়ার বড় অংশ দখল করে রয়েছে চীনে তৈরি নামকরা বিদেশি ব্র্যান্ডের গাড়ি। বৈশ্বিক কোম্পানিরা যখন নিজেদের চীনা অংশীদারদের সঙ্গে নিয়ে স্থানীয় বাজারের জন্য গাড়ি তৈরি করে, তখন তার অনেকগুলো এখন কৌশলে রাশিয়ার সীমান্তে পৌঁছে যাচ্ছে। তদ্ব্যতীত, অন্যান্য দেশে উৎপাদিত গাড়িও চীনের বন্দর ব্যবহার করে ট্রানজিট করে মস্কোর উদ্দেশ্যে পৌঁছে যাচ্ছে।
নিষেধাজ্ঞার আইনি ঝামেলা এড়াতে ব্যবসায়ীরা অত্যন্ত চতুর ও অভিনব কৌশল অবলম্বন করছেন। প্রতিবেদন বলছে, নতুন ও চকচকে গাড়িগুলোকে কাগজে-কলমে ‘ব্যবহৃত গাড়ি’ হিসেবে নিবন্ধন করা হচ্ছে। প্রথমবার চীনে নিবন্ধনের পর তা রাশিয়ায় ‘সেকেন্ড হ্যান্ড’ বা ব্যবহৃত হিসেবে দেখিয়ে রফতানি করা হয়। এতে মূল গাড়ির নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের অনুমতির প্রয়োজন হয় না, এবং সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর আইনি দায়বদ্ধতা থেকে নিজেকে রক্ষা করতে সক্ষম হয়। পরিসংখ্যান দেখায়, ২০২৫ সাল নাগাদ রাশিয়ায় বিক্রি হওয়া প্রায় দেড় লাখ বিদেশি গাড়ির অর্ধেকের বেশি এই চীনা রুট ব্যবহার করে প্রবেশ করেছে। ২০২২ সালে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় সাত লাখের বেশি বিদেশি ব্র্যান্ডের গাড়ি এইভাবে রাশিয়ায় বিক্রি হয়েছে।
অন্যদিকে, মার্সিডিজ-বেঞ্জ, বিএমডব্লিউ ও ফক্সওয়াগনের মতো শীর্ষস্থানীয় নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলো দাবি করে, তারা মোটেও রাশিয়ায় পণ্য বিক্রি পুরোপুরি বন্ধ রেখেছে এবং অননুমোদিত রফতানি বন্ধের জন্য কঠোর তদারকি চালাচ্ছে। তবে, তারা স্বীকার করেছে যে, তৃতীয় পক্ষ বা মধ্যস্বত্বভোগীরা এই গোপন সরবরাহ বন্ধ করতে পারছেন না, যেহেতু এই কাজটি বেশ জটিল ও সময়সাপেক্ষ। বিএমডব্লিউ জানিয়েছে, তাদের নিয়ন্ত্রণ ও সম্মতির বাইরে এসব গাড়ি রুশ বাজারে প্রবেশ করছে। ডিলাররা বলছেন, ধনী রুশ গ্রাহকদের মধ্যে পশ্চিমা ব্র্যান্ডের গাড়ির প্রতি বিশেষ আকর্ষণ থাকায় এই ‘প্যারালাল ইমপোর্ট’ বা সমান্তরাল আমদানি অব্যাহত রাখতে তারা বাধ্য হচ্ছেন।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই গোপন বাণিজ্য প্রবাহ বন্ধ করতে নজরদারি বাড়িয়েছে, তবুও বিশ্লেষকরা মনে করেন বিকল্প পথের সংখ্যা এত বেশি যে তা পুরোপুরি বন্ধ করাও খুব কঠিন। চীনের অভ্যন্তরীণ বাজারে বর্তমানে গাড়ির ব্যাপক উদ্বৃত্ত রয়েছে, যার কারণে সরকার বিভিন্ন ধরনের ভর্তুকি দিচ্ছে। ব্যবসায়ীরা এই সুযোগের অপব্যবহার করছে। এর ফলে বিশ্ব রাজনীতি ও নিষেধাজ্ঞার পারিপার্শ্বিকতা ডিঙিয়ে রাশিয়ার রাস্তায় এখনো আধুনিক, দামী বিদেশি গাড়ি দাপিয়ে বেড়াচ্ছে, যা রাশিয়ার অর্থনীতির স্থিতিস্থাপকতার একটি বড় প্রমাণ। এ পরিস্থিতি পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কার্যকারিতাকে নিয়ে বড় প্রশ্ন তোলার পাশাপাশি, নিষেধাজ্ঞা অচিরেই কার্যকরি হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে সন্দেহ বাড়িয়েছে।





