দেশের বৈদেশিক ঋণের প্রবাহে এক অস্বাভাবিক পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে। এই প্রথমবারের মতো, উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে প্রাপ্ত ঋণের অর্থের চেয়ে কিস্তি ও সুদসহ পরিশোধের পরিমাণ বেশি হয়ে গেছে। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) সম্প্রতি প্রকাশিত হালনাগাদ প্রতিবেদনে এই চিত্র স্পষ্ট হয়েছে।
তথ্য অনুযায়ী, জুলাই থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত সময়ে বাংলাদেশে বৈদেশিক ঋণের অর্থছাড়ের পরিমাণ হয়েছে প্রায় ২.৬৪১ বিলিয়ন ডলার। এর বিপরীতে, একই সময়ে দেশের জন্য নেওয়া বিভিন্ন ঋণের মূলধন ও সুদসহ মোট পরিশোধ হয়েছে ২.৬৭৬ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ, এই সময়কালে প্রাপ্তি বা নতুন ঋণের পরিমাণের চেয়ে পরিশোধের পরিমাণ প্রায় ৩৫ মিলিয়ন ডলার বেশি।
এছাড়াও, গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় চলতি অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে ঋণ খরচে হার বলিষ্ঠ ভাবে কমেছে। গত বছরের এই সময়ে ঋণ ছাড় ছিল প্রায় ৩.৯৩৮ বিলিয়ন ডলার, যেখানে চলতি বছর তা কমে দাঁড়িয়েছে ২.৫৭৪ বিলিয়ন ডলারে। অন্যদিকে, ঋণ পরিশোধ আরও বেড়ে গেছে, গত বছরের তুলনায় বৃদ্ধি পেয়েছে ১০ শতাংশ, যা বর্তমানে ২.৪১৮ বিলিয়ন ডলার।
ইআরডির কর্মকর্তাদের মতে, দেশের অস্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি শ্লথ হওয়ার কারণেই এই পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। অধিকাংশ পুরানো ঋণের কিস্তি দিতে হচ্ছে বেশি পরিমাণে। তবে, তারা আশাবাদ ব্যক্ত করছেন যে, সামগ্রিক অর্থবছর শেষে হিসাব করলে দেখা যাবে, অর্থছাড়ের তুলনায় পরিশোধের পরিমাণ বেশির ভাগ সময়ই কম থাকবে। গত অর্থবছরে যেখানে পরিশোধ হয়েছে ৪.০৮৬ বিলিয়ন ডলার, সেখানে ঋণ বরাদ্দ ছিল ৮.৫৬ বিলিয়ন ডলার। চলতি অর্থবছরও একই রকম পরিস্থিতি অব্যাহত থাকতে পারে বলে আশা করছেন তারা।
প্রতিবেদনে আরও জানা গেছে, এই অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে নতুন ঋণের প্রতিশ্রুতি বা চুক্তি স্বাক্ষরও কমে গেছে। এই সময়ে নতুন ঋণের জন্য মোট ২.২৭৪ বিলিয়ন ডলার প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৩.২৬ শতাংশ কম।
অর্থছাড়ের ক্ষেত্রে রাশিয়া এই সময়ে শীর্ষ অবস্থানে ছিল, যারা রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য ৫৭৬.০৪ মিলিয়ন ডলার ছাড় করেছে। এরপর রয়েছে বিশ্বব্যাংক, যারা ৫৫৫.৯৪ মিলিয়ন ডলার দিয়েছে। এছাড়া, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ৫৩৬.৬৪ মিলিয়ন, চীন ২২০.৪৫ মিলিয়ন, জাপান ১৮৩.৫১ মিলিয়ন এবং ভারত ১১৮.৩৯ মিলিয়ন ডলার ঋণ দিয়েছে।
প্রতিশ্রুতির ক্ষেত্রেও এগিয়ে রয়েছে এডিবি, যারা চলতি বছর প্রথম ছয় মাসে সর্বোচ্চ ১.২৭০ বিলিয়ন ডলারের ঋণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলো ৩৯১.৪২ মিলিয়ন এবং বিশ্বব্যাংক ২৬৫.৫০ মিলিয়ন ডলার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
একজন বিশ্লেষক বলে থাকেন, উন্নয়ন সহযোগীরা সাধারণত দীর্ঘমেয়াদি ও স্থিতিশীল নীতিনির্ধারণে সহায়ক সরকারগুলোর সঙ্গে বড় ধরনের ঋণের চুক্তি করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। নীতির অনিশ্চয়তা থাকলে নতুন ঋণ দেওয়া ও প্রতিশ্রুতি ধীর হয়ে যায়, যা দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতিকে আরও সংকটময় করে তুলতে পারে। তিনি পরামর্শ দেন, সুষ্ঠু ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও জরুরি প্রকল্পের অগ্রাধিকার দেওয়া আবশ্যক, যাতে উন্নয়ন অংশীদারদের সঙ্গে সুসমন্বয় সৃষ্টি হয়। অন্যথায়, বৈদেশিক সহায়তার ঘাটতি আরও তীব্র হয়ে উঠবে এবং দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বিঘ্নিত হবে।





