সোমবার, ৯ই মার্চ, ২০২৬, ২৪শে ফাল্গুন, ১৪৩২

পাম্পে পাম্পে ‘তেল নেই’, জ্বালানি সংকটে অসহায় চালকরা

ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ এবং মধ্যপ্রাচ্যের অস্থির পরিস্থিতির প্রভাবে বাংলাদেশের জ্বালানি তেলের বাজারে আকস্মিক অস্থিতিশীলতা দেখা দিয়েছে। আন্তর্জাতিক সরবরাহ চেইনে বিঘ্নের আশঙ্কায় সাধারণ মানুষ তেল মজুত করার জন্য প্যানিক বায়িং শুরু করেছেন, যা সরাসরি প্রভাব ফেলছে দেশের বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে। আজ রোববার (৮ মার্চ), রাজধানী ও জেলার ফিলিং স্টেশনগুলোতে ‘পেট্রোল নেই’ এবং ‘অকটেন নেই’ লেখা হাতে লেখা পোস্টার ঝুলতে দেখা গেছে, যার ফলে মোটরসাইকেল, ব্যক্তিগত গাড়ি ও গণপরিবহনের চালকদের জন্য অতীব কঠিন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।

গাজীপুর ও ঢাকার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, অধিকাংশ পাম্পই এখন কার্যত জনশূন্য। বিক্রয়কর্মীরা থাকলেও পাম্পগুলোতে কেবল নিরাপত্তাকর্মীরা থাকছেন, যারা কেবল নিরাপত্তা ব্যবস্থা দেখাশোনা করছেন। অনেক পাম্পের প্রবেশপথে দড়ি বা ব্যারিকেড দিয়ে তেলের সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। তেলের জন্য অনেক চালকই অপেক্ষা করে এক পাম্প থেকে অন্য পাম্পে ঘুরছেন, কিন্তু ফলাফল শূন্য। তেলের এই অভাবে রাস্তার পাশে অনেক যানবাহনই দোকানে বা গ্যারেজে অচল হয়ে পড়ছে, যা সাধারণ মানুষের জীবনে ব্যাপক বাধা সৃষ্টি করছে।

তবে কিছু পাম্পে সিএনজি সরবরাহ স্বাভাবিক থাকলেও সেখানে যানবাহনের দীর্ঘ লাইন ও ভিড় দেখা গেছে। ঢাকা- ময়মনসিংহ মহাসড়কের পাশে অনেক বাসই এখন আর চলাচল করতে পারছে না, ফলে সাধারণ যাত্রীরা বিপাকে পড়েছেন।

জ্বালানি তেলের এই সংকটে ক্ষুব্ধ চালকরা ইতিমধ্যে তাঁদের অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন। গাজীপুরের এশিয়া ফিলিং স্টেশনে দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকা বেসরকারি চাকরিজীবী কামরুল হাসান জানিয়েছেন, তিনি চারটি পাম্প ঘুরেও এক লিটার তেল পেতে পারেননি, ফলে কর্মস্থলে পৌঁছানো তার জন্য অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে, ব্যক্তিগত গাড়িচালক আরিফ আহমেদ বলেছেন, তার গাড়ির যে তেল আছে তা দিয়ে গ্যারেজে ফেরার মত অবস্থা নেই। এই পরিস্থিতি দেশের সাধারণ মানুষ ও অর্থনীতির জন্য বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

বিরক্তি প্রকাশ করেছেন কিছু পাম্পে তেলের স্বাভাবিক সরবরাহ থাকায় সেখানে ভিড় বেশ দেখা গেছে, যা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। নিরাপত্তাকর্মীদের অনেকটা হিমশিম খেতে হচ্ছে এই পরিস্থিতি সামলাতে।

অভূতপূর্ব এই সংকট মোকাবিলার জন্য সরকার আজ রোববার থেকেই দেশের সব জেলায় আনুষ্ঠানিকভাবে রেশনিং পদ্ধতিতে তেল বিক্রি শুরু করার ঘোষণা দিয়েছে। নির্দিষ্ট যানবাহনের পরিস্থিতির ভিত্তিতে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি) নতুন নীতিমালা জারি করেছে, যার মাধ্যমে তেল বিতরণ নিশ্চিত করা হবে। এর আগে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু ও প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত সব ফিলিং স্টেশনকে এই বিষয়ে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা প্রদান করেছেন। সরকার জানিয়েছে, বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার অনিশ্চয়তা মোকাবিলার জন্য এই আগাম সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

নতুন নীতিমালা অনুযায়ী, একজন মোটরসাইকেল এখন থেকে দিনে সর্বোচ্চ ২ লিটার পেট্রোল বা অকটেন সংগ্রহ করতে পারবে। ব্যক্তিগত কার বা গাড়ির ক্ষেত্রে এই সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে ১০ লিটার। এছাড়াও, স্পোর্টস ইউটিলিটি ভেহিক্যাল (এসইউভি) বা জিপ ও মাইক্রোবাসের জন্য দৈনিক ২০ থেকে ২৫ লিটার তেল বরাদ্দ রাখা হয়েছে। পরিবহন ক্ষেত্রে ডিজেল সরবরাহও কঠোর নিয়ম আরোপ করা হয়েছে। স্থানীয় রুটের বাস বা পিকআপ ভ্যান দৈনিক ৭০ থেকে ৮০ লিটার, আর দূরপাল্লার বাস, ট্রাক বা কাভার্ড ভ্যান সর্বোচ্চ ১১০ থেকে ২২০ লিটার ডিজেল নিতে পারবে। মূল লক্ষ্য হলো গুজব প্রতিরোধ ও সুষম বিতরণ নিশ্চিত করা, এবং পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলেও এই রেশনিং ব্যবস্থা অব্যাহত থাকবে বলে জানানো হয়েছে।

পোস্টটি শেয়ার করুন