মঙ্গলবার, ১০ই মার্চ, ২০২৬, ২৫শে ফাল্গুন, ১৪৩২

জ্বালানি সংকটের অজুহাতে অতিরিক্ত মূল্যে বিক্রি: গুজব না কি কৃত্রিম সংকট?

আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামের অস্থিরতা ও যুদ্ধের আশঙ্কা নিয়ে শুরু হয়েছে দেশজুড়ে জ্বালানি সংকটের গুজব। কিছু ব্যবসায়ী ও পাম্প মালিক অতিরিক্ত দামে তেল বিক্রি করে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এতে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যানবাহন চালকদের দীর্ঘ লাইনে দাঁড়াতে হচ্ছে, যা সাধারণ ভোক্তার জন্য ভয়াবহ পরিস্থিতি সৃষ্টি করছে। বাজারে তেলের ঘাটতি দেখাতে ডালওড়া হচ্ছে, অনেক পাম্পই গুদাম বন্ধ করে রেখেছে, ফলে সাধারণ মানুষকে বাড়তি ঝঞ্ঝাটের মুখে পড়তে হচ্ছে।

কুমিল্লার বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনের খবর বলছে, কোথাও কোথাও পেট্রোল ও অকটেনের সঙ্কট দেখা যাচ্ছে। চালকরা জানিয়েছেন, কঠিন লাইনে দাঁড়িয়ে থাকলেও, অনেক সময় তেল না পেয়ে ফিরে যেতে হচ্ছে। চকবাজারের এক পাম্পের ম্যানেজার ইকবাল হোসেন জানান, সরকারি নির্দেশনা মানা হচ্ছে না। অনেক চালক বেশি তেল নেন বা একবারের বেশি ফের লাইনে দাঁড়ান, যা নিয়ম বহির্ভূত। এই অনিয়মের ফলে সরবরাহে সমস্যা সৃষ্টি হচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

চালকদের অভিযোগ, সিন্ডিকেটের মাধ্যমে সীমিত পরিমাণে তেল বিক্রয় করা হচ্ছে, ফলে সাধারণ গ্রাহকরা ভোগান্তিতে পড়ছেন। একজন চালক আবদুল আওয়াল বলেন, ‘সরকারি নিয়মের বাইরে গিয়ে অনেক বেশি তেল নেওয়া হচ্ছে, অথচ কার্যত তেল প্রচুর আছে বলে জানানো হয়।’ অন্যদিকে পাম্প মালিকরা নিজেদের দাবি করছেন, বেশি পরিমাণ তেল গ্রাহকদের দেওয়ার জন্য সরবরাহে চাপ পড়ছে। তবে তারা আশাবাদী, সীমান্তে নিরাপত্তা জোরদার হলে তেল চোরাচালান বন্ধ হবে।

মানিকগঞ্জের হরিরামপুরে দেখা গেছে, কৃষকদের জন্য অত্যন্ত জরুরি ডিজেল ও ইঞ্জিনচালিত নৌকার জন্য তেলের সংকট বেড়েই চলেছে। এখানকার কৃষকরা এই চরম ঘাটতির কারণে चिंता প্রকাশ করছেন। মাঠে-ঘাটে খুচরা বাজারে দেখা গেছে, বেশি দাম দিলেই তেল পাওয়া যাচ্ছে, যা অপ্রতুলতার জন্য ব্যবসায়ীরা দায়ী। পরিস্থিতি আরও খারাপ হচ্ছে, কারণ পাইকারি ব্যবসায়ীরা সংকটের নামে দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে। ঘুরে দেখা যায়, সকাল থেকে এখানকার ভোক্তারাই বিভিন্ন দোকানে তেলের জন্য ছুটোছুটি করছেন, অনেকের হাতে খালি গ্যালন দেখা গেছে।

ঝিটকা, বলড়াসহ বিভিন্ন এলাকায় দেখা গেছে, দোকানে তেলের জন্য হাহাকার। অনেক মোবাইল চালক ও কৃষক দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকলেও, তেল না পেলে ফিরে যেতে বাধ্য হচ্ছেন। গোপনে বেশি দামে তেল নেওয়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। এক কৃষক বলেন, ‘ডিজেল না পাওয়ায় সেচের কাজ অচল হয়ে যাবে, ধানের ক্ষতি হবে।’ মালিকরাও প্রবেশাধিকার করতে গিয়ে হতাশ হন। জেলা ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের একটি সূত্র জানাচ্ছে, কেউ কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করলে তার বিরুদ্ধে দ্রুত আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

অতিরিক্ত তেল মজুতের কারণে মেহেরপুরেও দেখা যাচ্ছে, অধিকাংশ পাম্পই বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে ক্রেতারা যেখানে আকাঙ্ক্ষিত, সেখানে এসে তেল কিনছেন। এতে পৌরাণিকভাবে ক্ষতি হচ্ছে চাষিদের। কৃষকরা বলছেন, বোরো ধানের চাষের জন্য ডিজেল একান্তই অপরিহার্য, কিন্তু পাম্পের অচলাবস্থার কারণে তারা সেচের কাজ বন্ধ করে দেয়ার আভাস দিচ্ছেন। একই সঙ্গে ট্রাকচালকরা বলছেন, তেল সংকটের কারণে দীর্ঘ লাইন দিয়ে তেলে ভর্তি হতে হচ্ছে, যা দীর্ঘ পথের জন্য খুবই বিপজ্জনক।

জেলা তেল পাম্পের সভাপতি নুর হোসেন আংগুল জানাচ্ছেন, বর্তমানে তেলের দাম বা সংকটের কোনও খবর তাদের কাছে পৌঁছায়নি। তবে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের সতর্কতা আর আতঙ্কের কারণে মানুষ অতিরিক্ত তেল কিনছে। তিনি বলেন, ‘আমরা পরিস্থিতি অনুযায়ী নির্ধারিত দামে তেল বিক্রি করছি। যদি মজুত শেষ হয়ে যায়, তখন কিছু সময়ের জন্য পাম্প বন্ধ রাখতে হয়।’

উপজেলাগুলোর পরিস্থিতি নিরীক্ষণে দেখা গেছে, জীবননগর ও চুয়াডাঙ্গার বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে দীর্ঘ লাইন সরাসরি চোখে পড়েছে। মানুষ ট্যাঙ্কি ও বিভিন্ন পাত্রে করে তেল সংগ্রহ করছেন, যার মধ্যে মোটরসাইকেল আরোহীরা উল্লেখযোগ্য অংশ। অনেকেই বাইরে থেকে তেল কিনে গেছেন, কারণ খুচরা বাজারে তেলের সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট ম্যানেজাররাও জানাচ্ছেন, তেলের ব্যাপক চাহিদার কারণে প্রচুর বিক্রি হচ্ছে।

বিশেষ পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে দেখা যায়, এই পরিস্থিতি ঈদ উৎসবের আসন্ন সময়ে আরও জটিল হয়ে উঠবে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। কৃষি ও পরিবহণ খাতের এই সংকট, অকালবিপর্যয় ও অপ্রতুলতার কারণে দেশের অর্থনীতি ও জনগণের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হচ্ছে।

পোস্টটি শেয়ার করুন