হিন্দি সিনেমার ইতিহাসে ‘অ্যাংরি ইয়ং ম্যান’ ধারণাটি বেশ পুরনো। সচরাচর পর্দার সেই
নায়করা হন স্বল্পভাষী, প্রতিবাদী আর দুর্ধর্ষ। কিন্তু বয়স যদি হয় ৬৯, তবে সেই তকমা
কি মানায়? জৌলুসহীন বাস্তবধর্মী অ্যাকশন ড্রামা ‘সুবেদার’-এর মাধ্যমে অভিনেতা অনিল
কাপুর প্রমাণ করেছেন, প্রতিভা আর ব্যক্তিত্ব থাকলে বয়সের সংখ্যাটা তুড়ি মেরে উড়িয়ে
দেওয়া যায়। চিত্রনাট্যকার ও পরিচালক সুরেশ ত্রিবেণীর হাত ধরে অ্যামাজন প্রাইম
ভিডিওতে মুক্তি পাওয়া এই সিনেমাটি মূলত অনিল কাপুরের অতিমানবীয় অভিনয়ের ওপর ভর
করেই দাঁড়িয়ে আছে।
সিনেমার কাহিনী আবর্তিত হয়েছে অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা অর্জুন মৌর্যকে ঘিরে।
সীমান্তের দীর্ঘ দায়িত্ব পালন শেষে অর্জুন যখন ঘরে ফেরেন, তখন চারপাশের পরিবেশ
অনেকটাই বদলে গেছে। গল্পে এক দিকে যেমন পেশাগত জীবনের কঠোরতা রয়েছে, অন্যদিকে ফুটে
উঠেছে পারিবারিক সম্পর্কের টানাপোড়েন। অর্জুনের অনুপস্থিতিতে স্ত্রী মারা যান, যে
সময়ে তাঁর মেয়ে শ্যামা (রাধিকা মদন) বারবার সাহায্য চেয়েও বাবাকে পাশে পায়নি। বাবার
প্রতি মেয়ের এই চাপা ক্ষোভ এবং বিচ্ছেদের বেদনাই ছবির অন্যতম মানবিক ভিত্তি।
অর্জুনের প্রিয় ‘লাল জিপসি’ গাড়িটি যখন স্থানীয় অপরাধীদের লালসার মুখে পড়ে, তখন
থেকেই শুরু হয় মূল সংঘাত।
পুরো সিনেমায় অনিল কাপুর সংলাপের চেয়ে চোখের ভাষা এবং অভিব্যক্তির ওপর বেশি গুরুত্ব
দিয়েছেন। স্বল্প সংলাপের অর্জুন চরিত্রটি যেন কোনো আগ্নেয়গিরি, যা নিভৃতে দাউদাউ
করে জ্বলছে। এই বয়সে এসেও যেভাবে তিনি অ্যাকশন দৃশ্যগুলোতে নিজের সামর্থ্য
দেখিয়েছেন, তা প্রশংসার দাবি রাখে। অর্জুনের মেয়ে হিসেবে রাধিকা মদনের অভিনয় ছিল
অত্যন্ত বলিষ্ঠ। আধুনিক মেয়ে শ্যামা চরিত্রটি কেবল অসহায় এক সন্তান নয়, বরং নিজের
ওপর আসা অ্যাসিড আক্রমণ কিংবা ধর্ষণের হুমকির মতো প্রতিকূলতা সে একাই মোকাবিলা করার
সাহস রাখে। সৌরভ শুক্লা, মোনা সিং এবং আদিত্য রাওয়ালদের মতো দক্ষ অভিনয়শিল্পীরা ছোট
ছোট চরিত্রে অভিনয় করলেও ছবির কাহিনীকে আরও সংহত করেছেন।
পরিচালক সুরেশ ত্রিবেণী উত্তর ভারতের একটি ছোট, মলিন এবং আধিপত্যবাদী শহরের
প্রেক্ষাপট নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। ভাঙাচোরা অলিগলি আর দুর্নীতিগ্রস্ত ক্ষমতার
চক্র দর্শকদের সহজেই বাস্তব এক জগতে নিয়ে যায়। সাউন্ড ডিজাইন আর অধ্যায়ভিত্তিক গল্প
বলার ধরন ছবিটির শৈল্পিক মান বাড়িয়ে দিয়েছে। যদিও কাহিনীর পরিণতি বা ক্লাইম্যাক্স
কিছুটা অনুমেয়, তবুও এটি নিছক এক রিভেঞ্জ ড্রামা নয়; বরং ব্যক্তিগত ক্ষোভের আড়ালে
সামাজিক অবিচারের বিরুদ্ধে এক বৃদ্ধ যোদ্ধার লড়ে যাওয়ার গল্প।
সিনেমাটি গতিতে মাঝে মাঝে কিছুটা হোঁচট খেলেও বা দৈর্ঘ্য নিয়ে কিছু প্রশ্ন থাকলেও,
‘সুবেদার’ নিঃসন্দেহে একবার দেখার মতো ছবি। বলিউডে যেখানে চকচকে আভিজাত্যের
প্রদর্শনী বেশি থাকে, সেখানে এই ছবি অন্ধকার শহরের নিষ্ঠুর বাস্তবতা দেখানোর
পাশাপাশি বুড়ো হাড়ের এক জাদুকরী অভিনয় দেখার সুযোগ করে দিয়েছে। মূলত অনিল কাপুরের
রাজকীয় পদচারণা এবং সুরেশ ত্রিবেণীর পরিপক্ক নির্মাণের জন্যই এই অ্যাকশন থ্রিলারটি
দর্শকের হৃদয়ে জায়গা করে নেবে।





