গাজা উপত্যকায় ২০২৪ সালে ইসরায়েলি সামরিক অভিযানে নিহত পাঁচ বছর বয়সী ফিলিস্তিনি
শিশু রজবের মর্মান্তিক মৃত্যুকে কেন্দ্র করে নির্মিত চলচ্চিত্র ‘দ্য ভয়েস অব হিন্দ
রজব’ এখন ভারতের রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র উত্তেজনার সৃষ্টি করেছে। অস্কারে একাধিকবার
মনোনয়ন পাওয়া খ্যাতনামা তিউনিসিয়ান নির্মাতা কুসারু বিন হানিয়া পরিচালিত এই
সিনেমাটি ইতিমধ্যে বিশ্বের ৩০টিরও বেশি দেশে মুক্তি পেয়েছে এবং আন্তর্জাতিক বিভিন্ন
চলচ্চিত্র উৎসবে ব্যাপক প্রশংসা ও পুরস্কার কুড়িয়েছে। এমনকি এবারের অস্কারে এটি
আন্তর্জাতিক ফিচার ফিল্ম বিভাগে চূড়ান্ত মনোনয়ন লাভ করেছিল। তবে ভারতের সেন্ট্রাল
বোর্ড অব ফিল্ম সার্টিফিকেশন (CBFC) সিনেমাটিকে প্রদর্শনের অনুমতি না দেওয়ায় দেশটির
ভেতরে সেন্সরশিপ ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে এক নতুন বিতর্কের সূত্রপাত হয়েছে।
সিনেমাটি গত ৬ মার্চ ভারতের প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পাওয়ার কথা থাকলেও সেন্সর বোর্ড
শেষ মুহূর্তে এর ছাড়পত্র আটকে দেয়। চলচ্চিত্রটির ভারতীয় পরিবেশক মনোজ নন্দওয়ানা
জানিয়েছেন, বোর্ড থেকে লিখিতভাবে কোনো কারণ দর্শানো না হলেও মৌখিকভাবে জানানো হয়েছে
যে, এই সিনেমাটি মুক্তি পেলে ভারত ও ইসরায়েলের মধ্যকার বিদ্যমান শক্তিশালী কূটনৈতিক
সম্পর্কে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। মূলত একটি মানবিক ও সংবেদনশীল রাজনৈতিক
ইস্যুকে কেন্দ্র করে নির্মিত এই চলচ্চিত্রের প্রদর্শনী বন্ধ করার বিষয়টি ভারতের
গণতান্ত্রিক কাঠামোর ভেতরে সৃজনশীলতার স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
এই নিষেধাজ্ঞার প্রতিবাদে ভারতের বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো এখন ঐক্যবদ্ধভাবে সোচ্চার
হয়েছে। কংগ্রেস, সিপিএম, সমাজবাদী পার্টি এবং আরজেডি-র মতো প্রধান বিরোধী দলগুলোর
শীর্ষ স্থানীয় সংসদ সদস্যরা কেন্দ্রীয় তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী অশ্বিনী বৈষ্ণবের
কাছে একটি জোরালো প্রতিবাদলিপি পাঠিয়েছেন। এই তালিকায় রয়েছেন জয়রাম রমেশ, জন
ব্রিটাস, রাম গোপাল যাদব, মনোজ কুমার ঝা এবং রাজাঠি সালমাসহ প্রভাবশালী রাজনৈতিক
ব্যক্তিবর্গ। তাঁরা তাঁদের চিঠিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে, কোনো চলচ্চিত্রের
ছাড়পত্র পাওয়ার বিষয়টি কখনোই রাজনৈতিক স্বার্থ বা আন্তর্জাতিক সম্পর্কের সমীকরণের
ওপর ভিত্তি করে হওয়া উচিত নয়। তাঁদের মতে, একটি মানবিক ও সত্যনিষ্ঠ গল্পকে আটকে
দেওয়ার এই সিদ্ধান্ত সরাসরি বাকস্বাধীনতা ও শৈল্পিক সৃজনশীলতার পরিপন্থী।
তথ্যমন্ত্রীকে পাঠানো আবেদনে বিরোধী সাংসদেরা আরও দাবি করেছেন যে, ভারত একটি
গণতান্ত্রিক সমাজ হিসেবে সবসময়ই ভিন্নধর্মী ও মানবিক বিষয়ের ওপর নির্মিত সৃজনশীল
কাজকে স্বাগত জানিয়ে এসেছে। ‘দ্য ভয়েস অব হিন্দ রজব’ সিনেমাটি বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত
হওয়ার পরও ভারতে সেন্সরশিপের কবলে পড়া দেশটির আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তিকে ক্ষুণ্ণ করতে
পারে। তাঁরা অবিলম্বে সিনেমাটির যথাযথ মূল্যায়ন করে প্রেক্ষাগৃহে প্রদর্শনের অনুমতি
দেওয়ার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। এই সিনেমাটি ঘিরে তৈরি হওয়া বর্তমান
এই অচলাবস্থা কেবল চলচ্চিত্র জগতের বিষয় নয়, বরং তা এখন ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি
ও বৈশ্বিক কূটনীতির এক জটিল দ্বৈরথে পরিণত হয়েছে। সব মিলিয়ে চলচ্চিত্রটির ভবিষ্যৎ
এখন সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে।



