মিয়ানমারে চলমান দীর্ঘ রাজনৈতিক ও সামরিক সংকটের মধ্যেই এক বিতর্কিত প্রক্রিয়ায়
জান্তা প্রধান সিনিয়র জেনারেল মিন আং হ্লেইংকে দেশটির পরবর্তী রাষ্ট্রপতি হিসেবে
মনোনীত করা হয়েছে। সোমবার (৩০ মার্চ) মিয়ানমারের সংসদ অধিবেশনে আনুষ্ঠানিকভাবে এই
ঘোষণা দেওয়া হয়। গত সাধারণ নির্বাচনে প্রধান বিরোধী দলগুলোকে অংশগ্রহণের সুযোগ না
দিয়ে মাঠ প্রায় শূন্য করে ফেলায় মিন আং হ্লেইংয়ের এই মনোনয়ন ছিল অনেকটা নিশ্চিত।
মূলত তাঁর দুজন বিশ্বস্ত সহযোগীকে নামমাত্র প্রার্থী হিসেবে দাঁড় করানো হলেও তাঁদের
জয়ের কোনো বাস্তব সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।
পাঁচ বছর আগে এক রক্তক্ষয়ী সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করা এই
জেনারেলের জন্য রাষ্ট্রপতি হওয়ার এই পথটি বেশ আগে থেকেই সুপরিকল্পিত ছিল। যদিও ২০২১
সালের সেই অভ্যুত্থান এবং পরবর্তীতে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে তিনি দীর্ঘ সময় ধরে
পশ্চিমা বিশ্বের কঠোর কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার মধ্যে রয়েছেন। মিন আং
হ্লেইং এমন এক সময়ে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নিতে যাচ্ছেন যখন দেশটি এক ভয়াবহ
গৃহযুদ্ধের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এই কয়েক বছরে কয়েক হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন এবং
কোটি কোটি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। দেশটির একটি বিশাল অংশ
এখনো জান্তা বিরোধী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
নতুন গঠিত এই সংসদের প্রায় ৯০ শতাংশ সদস্যই মিন আং হ্লেইংয়ের প্রতি অনুগত, যা তাঁর
ক্ষমতাকে আরও নিষ্কণ্টক করেছে। সাংবিধানিক নিয়ম অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি পদে আসীন হতে
হলে তাঁকে সামরিক বাহিনী থেকে পদত্যাগ করতে হবে। তবে ক্ষমতার চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রণ
নিজের হাতে রাখতেই তিনি তাঁর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ও বিশ্বস্ত সহযোগী জেনারেল ইয়েউইনও-কে
পরবর্তী সেনাপ্রধান হিসেবে নির্বাচিত করেছেন। এর পাশাপাশি তিনি একটি নতুন ‘পরামর্শক
কাউন্সিল’ গঠন করেছেন, যা তাঁকে পর্দার আড়াল থেকে সামরিক ও বেসামরিক উভয় প্রশাসনের
ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার সুযোগ দেবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, নতুন এই প্রশাসন মূলত বর্তমান সামরিক সরকারেরই একটি
সম্প্রসারিত সংস্করণ হতে যাচ্ছে, যা এখন কেবল একটি ‘বেসামরিক আড়ালে’ পরিচালিত হবে।
মিন আং হ্লেইং কিংবা তাঁর সহযোগীরা ক্ষমতা দখলের পর থেকে বিরোধীদের ওপর যে কঠোর
দমননীতি চালিয়ে আসছিলেন, তাতে পরিবর্তনের কোনো জোরালো ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে না। এই
ধরণের সাজানো নির্বাচন ও ক্ষমতা হস্তান্তর মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ অস্থিতিশীলতা
নিরসনে কতটা ভূমিকা রাখবে, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে গভীর সংশয় ও উদ্বেগ বিরাজ
করছে। সব মিলিয়ে মিয়ানমারের ভবিষ্যৎ রাজনীতি এখন এক নতুন অনিশ্চয়তার মুখে পড়ল।





