বুধবার, ১লা এপ্রিল, ২০২৬, ১৮ই চৈত্র, ১৪৩২

ইরানের অনুমোদন পেল হরমুজ প্রণালিতে টোল সংগ্রহের পরিকল্পনা

বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচলকারী জাহাজগুলোর জন্য টোল সংগ্রহের পরিকল্পনায় অনুমোদন দিয়েছে ইরানের পার্লামেন্টারি কমিটি। এর ফলে, এই গুরুত্বপূর্ণ নৌরুটে নতুন করে অর্থ আয়ের পথ তৈরি হচ্ছে, যা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে ব্যাপক প্রভাব ফেলতে পারে। খবর অনুযায়ী, ইরানের বিপ্লবী গার্ড কোরের (আইআরজিসি) সম্পর্কিত সংবাদ সংস্থা ফারস এই বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।

প্রতিবেদনে জানানো হয়, ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা কমিশনের একজন সদস্য এই পরিকল্পনার অনুমোদন নিশ্চিত করেছেন। পরিকল্পনায় উল্লেখ করা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের জাহাজগুলোকে এই পথে চলাচল করতে বাধা দেওয়া হবে। এছাড়াও, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞায় জড়িত অন্যান্য দেশকেও এই পথ ব্যবহার করে জাহাজ চলাচলে বাধা দেওয়া হবে।

ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন এ ঘোষণা দেয়, ওমানের সহযোগিতায় এই নতুন টোল ব্যবস্থা বাস্তবায়িত হবে। এই ঘোষণা আসার পর বিশ্বব্যাপী তেল ও গ্যাস সরবরাহের উপর এর প্রভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

হরমুজ প্রণালী বৈশ্বিক তেল সরবরাহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রুট, যা পারস্য উপসাগর, ওমান উপসাগর এবং আরব সাগরকে সংযুক্ত করে। এই পথ দিয়ে ইরাক, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, কুয়েত, বাহরাইন ও কাতার থেকে অপরিশোধিত তেলবাহী জাহাজ চালাচলা হয়। মোট বিশ্ব তেলের ১৫-২০%, কনডেনসেট ও পেট্রোলিয়াম পণ্য, এবং ৩০% এর বেশি তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস এই পথ দিয়ে পরিবহন হয়। এর মধ্যে ৮২% তেল যায় এশিয়ায়, আর বাকি অংশ ইউরোপে, যেখানে চীনের মোট এলএনজির প্রায় ২৪% এই প্রণালী দিয়ে আসে।

প্রতিদিন এই পথে ২০০ থেকে ৩০০টি জাহাজ চলাচল করে, যা কখনো কখনো প্রতি ছয় মিনিটে এক জাহাজের মাধ্যমে ব্যস্ততার পরিচয় দেয়। দীর্ঘদিন ধরে ইরান হুমকি দিয়ে আসছে, যদি এই নৌপথে আঘাত করা হয়, তাহলে এটি বন্ধ করে দেয়া হবে। এর ফলত বৈশ্বিক বাজারে তেলের দাম হু হু করে বাড়বে বলে আশঙ্কা রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি হয়েছে।

তবে, মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর এই পরিস্থিতি মোকাবেলায় হুমকি দিয়ে জানিয়েছে, ইরান এই প্রণালিকে বন্ধ করে দিলে বা এমন কোনও আঘাত এলে অবিলম্বে এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ চালু করা হবে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও জানিয়েছেন, ‘যেকোনো উপায়ে হরমুজ প্রণালী সচল রাখা হবে।’ তিনি আরও বলেন, ট্রাম্প প্রশাসন সবসময়ই কূটনৈতিক সমাধানে বিশ্বাস করে। তিনি জানিয়েছেন, পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে কয়েক দিনের মধ্যেই সরাসরি আলোচনা হতে পারে।

অন্যদিকে, ইরানের স্থলসেনা মোতায়েনের খবরের জল্পনা চললেও, রুবিও স্পষ্ট করে বলেছেন, মার্কিন সামরিক অভিযান খুবই লক্ষ্যভিত্তিক। তিনি জানান, ‘কিছু মাস নয়, কয়েক সপ্তাহের মধ্যে লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব হবে। ইতিমধ্যে, তারা ইরানের বিমান ও নৌবাহিনীকে ক্ষতিগ্রস্ত করে দিয়েছে। এখন লক্ষ্য হলো তাদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন তৈরির কারখানা ধ্বংস করা।’

ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে ওয়াশিংটনের অবস্থান স্থির থাকা সত্ত্বেও, রুবিও অভিযোগ করেছেন, তেহরান পরমাণু অস্ত্র ব্যবহার করে বিশ্বকে ব্ল্যাকমেইল করতে চায়। তিনি আরও বলেন, ‘দেশটির শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন আমাদের লক্ষ্য।’

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হরমুজ প্রণালী কে’ই তার সার্বভৌম দাবি প্রত্যাখ্যান করে বলেন, ‘যখন যুদ্ধ শেষ হবে, এই জলপথ ইরান নিজেই চালু করবে, নতুবা যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা গঠিত আন্তর্জাতিক জোট এটি চালু করবে।’ আর এই পথ বন্ধ থাকলে, তেহরানকে কঠোর মূল্য দিতে হবে বলে সতর্কতা দেন তিনি।

উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা নিয়ে রুবিও জানান, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র মূলত সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার ও বাহরাইনের লক্ষ্য করে তৈরি। তাই এই অঞ্চলের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে, ইরানের সামরিক ক্ষমতা কমিয়ে আনার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন তিনি।

অপরদিকে, হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট এক বিবৃতিতে বলেছেন, ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের অবৈধ ইউরেনিয়াম সরবরাহ আটকাতে বিশেষ বাহিনী পাঠানোর বিষয়টি বিবেচনা করছে। তবে এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।

গত এক মাসে এই সংঘর্ষে ইরানে ১৯৩৭ জন এবং ইসরায়েলে ২০ জন নিহত হয়েছেন, সেইসাথে ১৩ জন মার্কিন সেনাও জীবন হারিয়েছেন। এই পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে উত্তাপ বৃদ্ধি পাচ্ছে।

পোস্টটি শেয়ার করুন