মধ্যপ্রাচ্যের চলমান রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং বিশ্বজুড়ে জাহাজ ভাড়া ও লজিস্টিক খরচ
বেড়ে যাওয়ার প্রভাবে আন্তর্জাতিক দুগ্ধজাত পণ্যের বাজারে বড় ধরনের পরিবর্তনের সংকেত
পাওয়া যাচ্ছে। পণ্য পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি ও বিশ্বব্যাপী চাহিদার ধরনে পরিবর্তনের ফলে
রফতানিকারক দেশগুলো বর্তমানে নতুন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে। তবে এই প্রতিকূল
পরিস্থিতির মধ্যেও ডেইরি পণ্যের বাজার আপাতত স্থিতিশীল রয়েছে বলে জানা গেছে।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ফারমারস উইকলি’র এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে যে, বিশেষজ্ঞরা
জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি ও লজিস্টিক খাতের ঝুঁকিকে বর্তমান অস্থিরতার মূল কারণ
হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে লোহিত সাগর ও সংলগ্ন এলাকায়
পণ্যবাহী জাহাজ চলাচলে ঝুঁকি বেড়েছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে বীমা ও পরিবহন খরচের
ওপর। অনেক কোম্পানি দীর্ঘ পথ ঘুরে পণ্য পাঠাতে বাধ্য হওয়ায় খরচ কয়েক গুণ বেড়ে গেছে।
নিউজিল্যান্ডের মতো দেশগুলো ভৌগোলিক কারণে এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে পণ্য
পাঠাতে কিছুটা সুবিধাজনক অবস্থায় থাকলেও পরোক্ষভাবে তারাও বাড়তি ব্যয়ের চাপ অনুভব
করছে।
সম্প্রতি ৪শ’তম গ্লোবাল ডেইরি ট্রেড (জিডিটি) নিলামের তথ্য অনুযায়ী, খরচ বাড়া
সত্ত্বেও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য এবং মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলোয়
দুগ্ধজাত পণ্য কেনার প্রবণতা বেড়েছে। অন্যদিকে প্রধান রফতানিকারক দেশ নিউজিল্যান্ডে
গত ফেব্রুয়ারিতে দুধ উৎপাদনের নতুন রেকর্ড তৈরি হয়েছে, যা গত বছরের একই সময়ের
তুলনায় প্রায় ৭ দশমিক ৪ শতাংশ বেশি। একইভাবে যুক্তরাষ্ট্রেও দুধের উৎপাদন বেড়েছে
প্রায় ২ দশমিক ৯ শতাংশ এবং দেশটিতে গত ৩০ বছরের মধ্যে বর্তমানে গবাদি পশুর সংখ্যা
সর্বোচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। আর্জেন্টিনা থেকেও দুধের উৎপাদন ১০ দশমিক ৬ শতাংশ বৃদ্ধির
খবর পাওয়া গেছে।
৩৯৯তম জিডিটি নিলামের তথ্যমতে, বাজারে দুগ্ধজাতীয় পণ্যের সরবরাহ বাড়লেও চাহিদা বেশ
শক্তিশালী ছিল। বিশেষ করে ননি ছাড়া গুঁড়া দুধ (এসএমপি), মাখন ও মোজারেলা পনিরের দাম
এবং চাহিদা উল্লেখযোগ্য হারে বাড়তে দেখা গেছে। যুক্তরাষ্ট্রে সরবরাহ সংকটের কারণে
ননীমুক্ত গুঁড়া দুধের দাম ২০২২ সালের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। বিশ্বব্যাপী
প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবারের প্রতি আগ্রহ বৃদ্ধি পাওয়ায় ডেইরি পণ্যের বাজারে বর্তমানে
চাঙ্গা ভাব বজায় রয়েছে।
রফতানির পরিমাণ বাড়লেও আয়ের ক্ষেত্রে নিউজিল্যান্ডে কিছুটা ভিন্ন চিত্র দেখা
যাচ্ছে। দেশটিতে রফতানি বাড়লেও আয়ের হার গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ২ দশমিক ৮
শতাংশ কমেছে, যার প্রধান কারণ বছরের শুরুতে পণ্যের দাম কম থাকা। এ ছাড়া বিশ্বের
অন্যতম বড় আমদানিকারক দেশ চীন বর্তমানে তাদের আমদানির পরিমাণ প্রায় ১৩ দশমিক ৭
শতাংশ কমিয়ে দিয়েছে। এর বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্রের রফতানি বেড়েছে ১০ দশমিক ৭ শতাংশ এবং
ইউরোপের দেশগুলোও রফতানি বাণিজ্য থেকে ভালো মুনাফা অর্জন করছে। তবে অস্ট্রেলিয়ার
বাজারে রফতানি ও আয়—উভয় ক্ষেত্রেই বড় ধস লক্ষ্য করা গেছে।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা ও জ্বালানি তেলের উচ্চমূল্য আগামী
দিনগুলোতে বাজারে অনিশ্চয়তা বজায় রাখবে। পরিবহন ও বীমা খরচ বাড়তে থাকলে তা সাধারণ
ভোক্তাদের ওপর বাড়তি চাপের সৃষ্টি করবে। তবে আশার কথা হলো, উচ্চমূল্য সত্ত্বেও
বিশ্ববাজারে দুগ্ধজাত পণ্যের চাহিদা কমেনি, যা বাজারের ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য
করছে। নিউজিল্যান্ডের বিশ্বখ্যাত ডেইরি কোম্পানি ফনটেরা এরই মধ্যে কৃষকদের জন্য
দুধের দাম বাড়ানোর পূর্বাভাস দিয়েছে। সার্বিকভাবে বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতি এবং
অর্থনৈতিক পরিবর্তনের প্রতি দুগ্ধজাত পণ্যের বাজার অত্যন্ত সংবেদনশীল হয়ে উঠেছে।





