মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সামরিক সংঘাতের সরাসরি প্রভাব পড়তে শুরু করেছে বৈশ্বিক খাদ্য বাজারে। এই সংঘাতের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্য বেড়ে যাওয়ার ফলस्वরূপ পণ্য পরিবহন খরচ অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা বিশ্বজুড়ে খাদ্যপণ্যের দামকেও তীব্রভাবে প্রভাবিত করছে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) সম্প্রতি তাঁদের এক প্রতিবেদনে এই উদ্বেগজনক তথ্য প্রকাশ করেছে। তাদের তথ্যানুসারে, মার্চ মাসে খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি হয়েছে ২.৪ শতাংশ, যা টানা দ্বিতীয় মাসের মতো বিশ্ববাজারে খাদ্যদামের বৃদ্ধি লক্ষ্য করা গেছে। এর ফলে কয়েক মাসের নিম্নমুখী প্রবণতাকে যে অচিরেই বদলে দিয়েছে তা স্পষ্টই বোঝা যায়।
বিশ্লেষণে দেখা যায়, সূচকের অন্তর্ভুক্ত বিভিন্ন খাদ্যপণ্যের মধ্যে ভোজ্য তেলের দাম গত এক মাসে ৫ শতাংশ বেড়েছে। সবচেয়ে বেশি অস্থিরতা দেখা গেছে চিনির বাজারে, যেখানে এক মাসের মধ্যে দাম প্রায় ৭ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। পাশাপাশি, গমের দামও ৪.৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা রুটি ও অন্যান্য খাদ্যশস্যের মূল উপাদান। বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা তৈরি হওয়ায় বিশ্বজুড়ে খাদ্য মূল্যস্ফীতির বিপদ আরও ভয়াবহ রূপে দেখা দিতে পারে। জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে কৃষি উৎপাদন, প্রক্রিয়াকরণ এবং সরবরাহের প্রতিটি ধাপে ব্যয় বেড়ে চলেছে, ফলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে।
খাদ্য সংকটের পেছনে মূল কারণ হিসেবে যুদ্ধের পাশাপাশি সারের সরবরাহে বিঘ্নকেও গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। বৈশ্বিক কৃষি ব্যবস্থায় অপরিহার্য মোট সারের প্রায় এক তৃতীয়াংশ পরিবহন হয় কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী দিয়ে। চলমান সংঘাতের কারণে এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথটি কার্যত অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছে, ফলে বিশ্ববাজারে সারের সংকট আরও প্রকট হয়ে উঠেছে এবং সরবরাহের সিংহভাগই মার খাচ্ছে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা সতর্ক করে দিচ্ছেন, এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে ২০২৬ সালের প্রথমার্ধে বিশ্ববাজারে খাদ্যদামের আরও ১৫ থেকে ২০ শতাংশ বৃদ্ধি হতে পারে।
গমের বাজারে অস্থিরতার পেছনে যুদ্ধের পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কিছু প্রাকৃতিক কারণও কাজ করছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে দীর্ঘমেয়াদী খরা ও সারের অস্বাভাবিক দাম বেড়ে যাওয়ার ফলস্বরূপ, অস্ট্রেলিয়ায় গম চাষাবাদ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। এর ফলে বিশ্ববাজারে সরবরাহের ঘাটতি দেখা দিয়েছে। যদিও ইউরোপে গমের ফলন তুলনামূলকভাবে ভালো হয়েছে এবং কিছু বড় রপ্তানিকারক দেশের মধ্যে প্রতিযোগিতা দৃঢ়, তারপরও যুদ্ধের প্রভাব এবং সরবরাহ সংকট মোকাবেলা করে বাজারের ভারসাম্য ফিরিয়ে আনা কঠিন হয়ে পড়ছে। সবশেষে, মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত কেবল এক অঞ্চলের সামরিক সংকট নয়; বরং এটি এখন বৈশ্বিক খাদ্য নিরাপত্তার জন্য বড় ধরনের একটি হুমকি হিসেবে দাঁড়িয়ে গেছে।





