বুধবার, ৮ই এপ্রিল, ২০২৬, ২৫শে চৈত্র, ১৪৩২

সীমানা ছাড়িয়ে বিশ্বজয়: ভিনদেশে জন্মেও ফুটবলের সোনালী ট্রফি জেতা খেলোয়াড়রা

বর্তমান বিশ্বায়নের যুগে ফুটবল মাঠের লড়াই কেবল ভৌগোলিক সীমানায় সীমাবদ্ধ নয়। আধুনিক ফুটবলের ইতিহাসে দেখা যায়, অনেক খেলোয়াড়ের জন্মভূমি আলাদা হলেও তারা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিজ মনোভাব, দক্ষতা ও পরিশ্রমে স্বদেশের প্রতিনিধিত্ব করে উজ্জ্বল কীর্তি স্থাপন করেছেন। এই প্রবণতা বিশ্বকাপের ইতিহাসেও গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করে আসছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিশ্বকাপ জয়ীদের মধ্যে ২২ দলের মধ্যে অন্তত এক বা একাধিক খেলোয়াড়ের জন্মভূমি ছিল অন্য দেশ। এই বৈচিত্র্যময়তা দলগুলোর শক্তিকে সমৃদ্ধ করেছে და প্রমাণ করেছে, মেধা ও প্রতিভার কোনো নির্দিষ্ট মানচিত্র নেই।

বিশ্বের প্রথম দিকে এই প্রবণতা সবচেয়ে বেশি দেখা গিয়েছিল ইতালির জাতীয় দলের মধ্যে। ১৯৩৪ সালে বিশ্বকাপ জয়ী ইতালির দলে ছিলেন আর্জেন্টাইন বংশোদ্ভূত বেশ কয়েকজন খেলোয়াড়, যেমন আত্তিলিও ডেমারিয়া, এনরিকো গুয়াইতা ও রাইমুন্ডো ওরসি। তাদের মধ্যে বিশেষ করে লুইস মন্টি স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবেন, যিনি ১৯৩০ সালে আর্জেন্টিনার হয়ে আর ১৯৩৪ সালে ইতালির হয়ে বিশ্বকাপের ফাইনাল খেলেছিলেন—a দৃষ্টান্ত। একই দলে ছিলেন ব্রাজিলে জন্ম নেওয়া আনফিলোজিনো গুয়ারিসি ও ফ্রান্সে জন্ম নেওয়া ইতালীয় কিংবদন্তি ফেলিস বোরেল। এছাড়াও, অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি সাম্রাজ্যের (বর্তমানে ক্রোয়েশিয়া) ফিউমে অঞ্চলের জন্ম নেয়া মারিও ভার্গলিয়ানও ইতালির হয়ে বিশ্বকাপ জিতেছিলেন। ১৯৩৮ সালে ক্রীড়া ইতিহাসে নতুন এক অধ্যায় লেখা হয়, যখন ইতালির বিশ্বজয়ে মূল ভূমিকা রেখেছেন উরুগুয়েতে জন্ম নেওয়া মিগুয়েল আন্দ্রেওলো। এরপর ১৯৫০ সালে উরুগুয়ের ঐতিহাসিক ‘মারাকানাজো’ ম্যাচে ব্রাজিলের বিরুদ্ধে জয় অর্জনে অংশ নেন আর্নেস্তো ভিদাল, যিনি ইতালি (বর্তমানে ক্রোয়েশিয়া) জন্মগ্রহণ করেছিলেন।

বিশ্বজয়েতের ধারায় অন্য লাতিন আমেরিকার দেশ উরুগুয়েও পিছিয়ে ছিল না। ১৯৫০ সালে ব্রাজিলের মুখোমুখি উরুগুয়ে যখন দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়, সেই দলে ছিলেন আর্জেন্টিনায় জন্ম নেওয়া হলেও উরুগুয়ের হয়ে খেলেছেন তাঁদের কিছু খেলোয়াড়। আবার ১৯৫৪ সালে জার্মানি বা পশ্চিম জার্মানির শিরোপা জয়ের পেছনে ভিনদেশি মেধার অবদান ছিল শুভ। পোল্যান্ডে জন্ম নেওয়া রিচার্ড হারমান ও রোমানিয়ায় জন্ম নেওয়া জোসেফ পোসিপাল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। ১৯৭৪ সালের চ্যাম্পিয়ন জার্মানির দলের মধ্যে ছিলেন ব্রাজিলের ভিনদেশি খেলোয়াড়, যেমন বেলজিয়ামের ইউপেন জন্ম নেওয়া হার্বার্ট উইমার, তাঁর অসামান্য পারফরম্যান্সের জন্য। ১৯৮২ সালে ইতালি যখন তৃতীয় বার শিরোপা জেতে, তখন দলের রক্ষণভাগের প্রধান ছিলেন লিবিয়াতে জন্ম নেওয়া ক্লাউদিও জেন্টিলে।

আধুনিক ফুটবলে ভিনদেশি খেলোয়াড়দের ভূমিকা অনস্বীকার্য। ফ্রান্সের শক্তিমত্তার পেছনে অনেক খেলোয়াড়ের ভিন্নভাষার ও ভিন্নভূমির অভিজ্ঞতা রয়েছে। ১৯৯৮ সালে প্রথম বিশ্বকাপ জয়ী দলটির রক্ষণে ছিলেন ঘানায় জন্ম নেওয়া মার্সেল দেশাইলি, যিনি বিশ্বকাপের ফাইনালে লাল কার্ড পাওয়া আরও একজন। একই দলের মিডফিল্ডে ছিল সেনেগালের প্যাট্রিক ভিয়ার। ২০১৮ সালে ফ্রান্সের জন্য খেলা খেলোয়াড়দের মধ্যে কঙ্গোতে জন্ম নেওয়া স্টিভ মান্দান্দা ও ক্যামেরুনে জন্ম নেওয়া ইয়োন্দে উমতিতি এই ধারাকে আরও সমৃদ্ধ করেছে। উমতিতির ফাইনালজয়ী গোল ফ্রান্সকে ইতিহাসের পথে এগিয়ে নিয়ে যায়।

২০০৬ সালের চ্যাম্পিয়ন ইতালির দলে ছিলেন আর্জেন্টিনার জন্ম নেওয়া মাউরো কামোরানেসি ও ইংল্যান্ডে জন্ম নেওয়া সিমোনে পেরোত্তা, যারা গুরুত্বপূর্ণ ভরসা ছিলেন ফাইনালে। ২০১৪ সালে বিশ্বময় জার্মানি যখন চ্যাম্পিয়ন হয়, তখন দলের দুই প্রধান তারকা—মিরোস্লাভ ক্লেয়াসা ও লুকাস পডলস্কি—পোল্যান্ডে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। ক্লেয়াসা পরবর্তীতে ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতার রেকর্ডও গড়েন। সেই দলের আরেক খেলোয়াড়, টনি ক্রুস, জন্ম হয় পূর্ব জার্মানিতে, দুই জারানির একীকরণের মাত্র ৯ মাস আগে। এই সব উদাহরণ দেখায়, মাঠের প্রতিযোগিতায় দেশপ্রেমের সঙ্গে পেশাদারিত্বের সমন্বয় সম্ভব, এবং ভিনদেশি খেলোয়াড়েরা ফুটবল ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবেই নিজেদের নাম খোদাই করে নিয়েছেন। এই সব গল্প বাস্তবতায় প্রমাণ করে, সীমানা ভেঙে নিজের স্বপ্নের পথে এগিয়ে যাওয়া একজন ফুটবলার ভবিষ্যতে একজন জাতীয় নায়কের চেয়েও বড় হয়ে উঠতে পারেন।

পোস্টটি শেয়ার করুন