বুধবার, ৮ই এপ্রিল, ২০২৬, ২৫শে চৈত্র, ১৪৩২

বৈষম্যের বিরুদ্ধে ইয়ামালকে সমর্থন দিয়ে একসঙ্গে লড়াইয়ের ঘোষণা ভিনিসিয়ুসের

ফুটবল মাঠে রিয়াল মাদ্রিদ ও বার্সেলোনার লড়াই সবসময়ই উত্তেজনার পারদ চড়ায়, কিন্তু

মাঠের বাইরে সামাজিক ন্যায়বিচার ও বর্ণবাদবিরোধী লড়াইয়ে এবার এক অভূতপূর্ব ঐক্যের

নজির গড়লেন দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ক্লাবের দুই মহাতারকা ভিনিসিয়ুস জুনিয়র এবং

লামিনে ইয়ামাল। বর্ণবাদের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে সোচ্চার থাকা ভিনিসিয়ুস এবার পাশে

দাঁড়িয়েছেন বার্সেলোনার তরুণ তুর্কি ইয়ামালের, যিনি সম্প্রতি স্প্যানিশ সমর্থকদের

একটি অংশের ধর্মীয় বিদ্বেষমূলক আচরণের শিকার হয়েছেন। ফুটবলীয় শত্রুতা পাশে ঠেলে এই

দুই তারকার একীভূত অবস্থান বিশ্ব ফুটবলে বৈষম্যবিরোধী লড়াইকে নতুন এক উচ্চতায় নিয়ে

গেছে।

ঘটনার সূত্রপাত হয় সম্প্রতি এস্পানিওলের মাঠে স্পেন ও মিশরের মধ্যকার একটি

আন্তর্জাতিক প্রীতি ম্যাচকে কেন্দ্র করে। গোলশূন্য ড্র হওয়া সেই ম্যাচে দর্শকদের

একটি অংশ মিশরীয় খেলোয়াড়দের লক্ষ্য করে মুসলিম-বিদ্বেষী স্লোগান দিতে শুরু করে।

গ্যালারি থেকে ভেসে আসা ‘যে লাফাবে না, সে-ই মুসলিম’—এমন বিতর্কিত স্লোগানের কঠোর

সমালোচনা করেন বার্সেলোনার ১৭ বছর বয়সী উইঙ্গার লামিনে ইয়ামাল। সামাজিক

যোগাযোগমাধ্যমে অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে নিজের ধর্মীয় পরিচয় তুলে ধরে ইয়ামাল জানান,

একজন মুসলিম হিসেবে এমন আচরণ তাঁর কাছে অত্যন্ত অসম্মানজনক এবং অসহনীয়। তিনি স্পষ্ট

করে দেন যে, মাঠের ভেতর ধর্মকে কৌতুক হিসেবে ব্যবহার করা মূলত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের

অজ্ঞতা ও বর্ণবাদী মানসিকতারই বহিঃপ্রকাশ।

লামিনে ইয়ামালের এই প্রতিবাদের পর তাঁর প্রতি জোরালো সমর্থন জানিয়েছেন রিয়াল

মাদ্রিদের ব্রাজিলিয়ান ফরোয়ার্ড ভিনিসিয়ুস জুনিয়র। চ্যাম্পিয়ন্স লিগে বায়ার্ন

মিউনিখের বিপক্ষে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচের আগে এক সংবাদ সম্মেলনে এসে ভিনিসিয়ুস সরাসরি

বর্ণবাদ ও ইয়ামাল ইস্যু নিয়ে কথা বলেন। ভিনিসিয়ুস জানান, এসব বিষয় নিয়ে বারবার কথা

বলা অত্যন্ত কষ্টদায়ক হলেও এই লড়াই চালিয়ে যাওয়া জরুরি। তিনি ইয়ামালের কথা বলার

সাহসকে প্রশংসা করে বলেন যে, এটি অন্যান্য ভুক্তভোগীদেরও আওয়াজ তুলতে অনুপ্রাণিত

করবে। ভিনিসিয়ুস আরও উল্লেখ করেন যে, খ্যাতিমান খেলোয়াড় হিসেবে তাঁদের কথা বলার

সুযোগ থাকলেও সাধারণ মানুষ বা কৃষ্ণবর্ণের দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে এই বৈষম্যের বিরুদ্ধে

অনেক বেশি সংগ্রাম করতে হয়, তাই তাঁদের সবার ঐক্যবদ্ধ হওয়া প্রয়োজন।

ভিনিসিয়ুস জুনিয়র নিজে একাধিকবার বর্ণবাদী আক্রমণের শিকার হয়েছেন, যা বিশ্ব ফুটবলে

ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছিল। সাম্প্রতিক চ্যাম্পিয়ন্স লিগে লিসবনে বেনফিকার

খেলোয়াড় জিয়ানলুকা প্রেস্টিয়ানি তাঁকে বর্ণবাদী গালি দেওয়ায় উয়েফা তাকে নিষিদ্ধও

করেছিল। নিজের সেই অভিজ্ঞতার প্রেক্ষাপট থেকেই ভিনিসিয়ুস মনে করেন, বর্ণবাদ বা

ধর্মবিদ্বেষ কেবল নির্দিষ্ট কোনো দেশের সমস্যা নয়, বরং এটি একটি বৈশ্বিক সংকট।

স্পেন, জার্মানি বা পর্তুগালকে ঢালাওভাবে বর্ণবাদী দেশ না বললেও, এসব দেশে থাকা

বর্ণবাদী মানসিকতার মানুষের বিরুদ্ধে সম্মিলিত প্রতিরোধের কোনো বিকল্প নেই বলে তিনি

বিশ্বাস করেন।

দুই ক্লাবের বৈরিতা ভুলে ভিনিসিয়ুস ও ইয়ামালের এই সংহতি ফুটবল বিশ্বকে এক শক্তিশালী

বার্তা দিয়েছে। ক্রীড়া বিশ্লেষকদের মতে, যখন মাঠের প্রধান তারকারা এভাবে একজোট হয়ে

অন্যায়ের প্রতিবাদ করেন, তখন তা সাধারণ সমর্থকদের মধ্যে গভীর প্রভাব ফেলে।

ভিনিসিয়ুস তাঁর বক্তব্যে আগামীর এক বৈষম্যহীন ফুটবলের স্বপ্ন ব্যক্ত করেছেন, যেখানে

কোনো খেলোয়াড় বা সাধারণ মানুষকে তাঁদের পরিচয় বা বিশ্বাসের জন্য লাঞ্ছিত হতে হবে

না। ফুটবলকে কেবল উপভোগের মাধ্যম হিসেবে টিকিয়ে রাখতে এমন বলিষ্ঠ নেতৃত্ব আগামী

দিনে বর্ণবাদ নির্মূলে মাইলফলক হয়ে থাকবে বলে আশা করা হচ্ছে।

পোস্টটি শেয়ার করুন