মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান চরম উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে
মার্কিন অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বড় ধরনের ভূমিকম্প শুরু হয়েছে। ইরানের সঙ্গে সাময়িক
যুদ্ধবিরতির ঘোষণা এলেও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ওপর থেকে চাপের
পাহাড় সরেনি। বরং প্রভাবশালী মার্কিন কংগ্রেসওম্যান আলেক্সান্দ্রিয়া ওকাসিও-কর্তেজ
(এওসি) পুনরায় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে অভিশংসনের মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত করার জোরালো
দাবি তুলেছেন। তাঁর মতে, সাময়িক এই যুদ্ধবিরতি কোনো সমাধান নয় এবং এটি বর্তমান
বিপজ্জনক পরিস্থিতির বিন্দুমাত্র পরিবর্তন ঘটাতে পারেনি।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সাম্প্রতিক কিছু কর্মকাণ্ড এবং বক্তব্যকে কেন্দ্র করে
বিশ্বজুড়ে যে সমালোচনার ঝড় উঠেছে, তার রেশ ধরেই এই অভিশংসনের দাবি সামনে এসেছে।
বিশেষ করে ইরানকে দেওয়া সময়সীমা শেষ হওয়ার ঠিক আগমুহূর্তে ট্রাম্পের একটি বিতর্কিত
সোশ্যাল মিডিয়া পোস্ট পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণের বাইরে নিয়ে যায়। সেখানে তিনি
লিখেছিলেন যে, ‘একটি আস্ত সভ্যতা আজ পৃথিবীর বুক থেকে চিরতরে মুছে যেতে পারে।’
ট্রাম্পের এই প্রচ্ছন্ন হুমকিকে ‘গণহত্যার উস্কানি’ হিসেবে অভিহিত করে তাঁর তীব্র
সমালোচনা করেছেন ওকাসিও-কর্তেজ। তিনি অভিযোগ করেছেন যে, একজন রাষ্ট্রপ্রধান হয়ে
এভাবে একটি দেশের সাধারণ জনগণকে নিশ্চিহ্ন করার হুমকি দেওয়া কেবল অমানবিকই নয়, বরং
আন্তর্জাতিক আইনের চরম লঙ্ঘন।
ট্রাম্পের এই যুদ্ধংদেহী মনোভাব কেবল আন্তর্জাতিকভাবেই নয়, বরং নিজ দেশের
অভ্যন্তরেও তাঁকে চরম অজনপ্রিয় করে তুলেছে। ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ডলার খরচ করে
মধ্যপ্রাচ্যের এই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার সিদ্ধান্ত মার্কিন অর্থনীতিকে খাদের কিনারায়
ঠেলে দিয়েছে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। সাধারণ মার্কিনিদের করের অর্থ জনকল্যাণে
ব্যয় না করে ধ্বংসাত্মক যুদ্ধে অপচয় করার ফলে জনরোষ এখন তুঙ্গে। এর ওপর ট্রাম্পের
কর্তৃত্ববাদী শাসনশৈলী এবং বিভিন্ন বিতর্কিত আইন প্রণয়নও এই অসন্তোষে ঘি ঢেলেছে। এই
পরিস্থিতির প্রতিফলন দেখা গেছে গত মাসে আয়োজিত ‘নো কিংস’ আন্দোলনে, যেখানে আয়োজকদের
দাবি অনুযায়ী প্রায় ৮০ লাখ মানুষ রাজপথে নেমে ট্রাম্পের পদত্যাগ দাবি করেছিলেন।
যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে এর আগে কোনো আন্দোলনে এত বিশাল জনসমাগম দেখা যায়নি।
ডেমোক্র্যাট নেত্রী আলেক্সান্দ্রিয়া ওকাসিও-কর্তেজ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্সে
দেওয়া এক পোস্টে অত্যন্ত কঠোর ভাষায় তাঁর প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। তিনি লিখেছেন
যে, প্রেসিডেন্ট সরাসরি ইরানি জনগণের বিরুদ্ধে গণহত্যার হুমকি দিয়েছেন এবং সেই
হুমকি এখনো বহাল রয়েছে। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ট্রাম্পের এই খামখেয়ালি আচরণের
ফলে বিশ্ব শান্তি এবং যুক্তরাষ্ট্রের নিজের মঙ্গল আজ চরম ঝুঁকির মুখে। এমতাবস্থায়
মন্ত্রিসভা কিংবা কংগ্রেস—যেকোনো উপায়ে প্রেসিডেন্টকে দ্রুত ক্ষমতা থেকে সরানো
জরুরি হয়ে পড়েছে বলে তিনি মনে করেন। ওকাসিও-কর্তেজের মতে, পুরো দেশ এখন এক ভয়াবহ
বিপদের কিনারায় দাঁড়িয়ে আছে।
উল্লেখ্য যে, ওকাসিও-কর্তেজ একা নন, তাঁর সঙ্গে ডজনখানেক ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতাও
ট্রাম্পের অপসারণ চেয়ে একমত পোষণ করেছেন। যদিও দুই সপ্তাহের একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতি
কার্যকর হয়েছে, তবুও বিরোধীরা মনে করছেন ট্রাম্পের হাতে নিউক্লিয়ার কোড বা সামরিক
নিয়ন্ত্রণ থাকা দেশের নিরাপত্তার জন্য বড় ঝুঁকি। তাঁরা দাবি করেছেন যে,
প্রেসিডেন্টের মানসিক অস্থিরতা ও অবিবেচনাপ্রসূত সিদ্ধান্ত যেকোনো সময় বিশ্বকে
তৃতীয় মহাযুদ্ধের দিকে ঠেলে দিতে পারে। ফলে যুদ্ধবিরতির ঘোষণা সত্ত্বেও ট্রাম্পকে
ক্ষমতাচ্যুত করার আন্দোলন ও আইনি প্রক্রিয়া থেকে পিছু হটতে রাজি নন এই প্রভাবশালী
মার্কিন রাজনীতিকরা। সব মিলিয়ে হোয়াইট হাউসকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক
অঙ্গন এখন উত্তপ্ত আগ্নেয়গিরির রূপ নিয়েছে।





