শুক্রবার, ১০ই এপ্রিল, ২০২৬, ২৭শে চৈত্র, ১৪৩২

চলে গেলেন বরেণ্য শিল্প নির্দেশক ও জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারপ্রাপ্ত চিত্রশিল্পী তরুণ ঘোষ

বাংলাদেশের শিল্পকলা ও চলচ্চিত্র অঙ্গনের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র, জাতীয় চলচ্চিত্র

পুরস্কারপ্রাপ্ত বিশিষ্ট শিল্প নির্দেশক ও প্রথিতযশা চিত্রশিল্পী তরুণ ঘোষ আর নেই।

গতকাল বুধবার দিবাগত রাত দেড়টার দিকে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ

করেন। মৃত্যুকালে গুণী এই শিল্পীর বয়স হয়েছিল ৭৩ বছর। তাঁর প্রয়াণের বিষয়টি নিশ্চিত

করেছেন বিশিষ্ট চলচ্চিত্র নির্মাতা এন রাশেদ চৌধুরী। মৃত্যুকালে তিনি স্ত্রী ও এক

পুত্রসন্তানসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী ও ছাত্র-ছাত্রী রেখে গেছেন। তাঁর মৃত্যুতে দেশের

সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে এক গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে।

তরুণ ঘোষের জন্ম রাজবাড়ী জেলায়। শিল্পের প্রতি আজন্ম তৃষ্ণা থেকে তিনি ১৯৭৭ সালে

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউট (বর্তমানে চারুকলা অনুষদ) থেকে স্নাতক

সম্পন্ন করেন। এরপর শিল্পের তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক জ্ঞানকে আরও সমৃদ্ধ করতে তিনি

ভারতের বরোদার এম এস বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৮৬ সালে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।

তাঁর কর্মজীবন ছিল বহুমুখী অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ। ১৯৭৯ সালে তিনি রাজশাহী

বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন এবং বিভাগটির প্রতিষ্ঠাতা

শিক্ষকদের একজন হিসেবে এর বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। পরবর্তীতে ১৯৮৯

সালে তিনি বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরে যোগদান করেন এবং দীর্ঘকাল নিষ্ঠার সাথে দায়িত্ব

পালন শেষে ২০১২ সালে ‘কিপার’ পদ থেকে অবসর গ্রহণ করেন।

চিত্রকলার পাশাপাশি বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের শৈল্পিক বিবর্তনে তরুণ ঘোষের অবদান

অবিস্মরণীয়। ইমপ্রেস টেলিফিল্মের প্রযোজনায় আবু সাইয়ীদ পরিচালিত ‘কিত্তনখোলা’

চলচ্চিত্রের অনবদ্য শিল্প নির্দেশনার জন্য তিনি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে ভূষিত

হন। এ ছাড়া আন্তর্জাতিকভাবে সমাদৃত তারেক মাসুদের ‘মাটির ময়না’, স্বল্পদৈর্ঘ্য

চলচ্চিত্র ‘নরসুন্দর’ এবং এন রাশেদ চৌধুরীর ‘চন্দ্রাবতী কথা’র মতো শিল্পমানসম্পন্ন

চলচ্চিত্রে তাঁর সৃজনশীল মেধার পরিচয় পাওয়া যায়। জীবনের শেষ লগ্নে এসে তিনি এন

রাশেদ চৌধুরীর মুক্তিপ্রতীক্ষিত সিনেমা ‘সখী রঙ্গমালা’-তেও শিল্প নির্দেশনার

দায়িত্ব পালন করেছেন।

চিত্রশিল্পী হিসেবেও তরুণ ঘোষ ছিলেন আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে সমাদৃত। আবহমান বাংলার

লোকজ সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে আধুনিক ক্যানভাসে তুলে ধরতে তাঁর জুড়ি ছিল মেলা ভার।

বিশেষ করে তাঁর বিখ্যাত ‘বেহুলা’ সিরিজ বোদ্ধামহলে বিশেষভাবে প্রশংসিত এবং এই

কালজয়ী কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি মর্যাদাপূর্ণ ‘এশিয়ান আর্ট অ্যাওয়ার্ড’ অর্জন

করেন। এ ছাড়া ১৯৮৫ থেকে ১৯৮৭ সাল পর্যন্ত তিনি এম এস বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ‘ফোক

পেইন্টিং রিসার্চ অ্যান্ড ডকুমেন্টেশন প্রোগ্রাম’-এ যুক্ত থেকে লোকজ চিত্রকলার

গবেষণায় উল্লেখযোগ্য অবদান রাখেন। তাঁর প্রয়াণে বাংলাদেশ এক নিভৃতচারী ও মেধাবী

শিল্পযোদ্ধাকে হারালো, যাঁর অভাব দীর্ঘকাল অনুভূত হবে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ এবং

শিল্পানুরাগীরা তাঁর বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করেছেন।

পোস্টটি শেয়ার করুন