বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্যে নতুন করে অস্থিরতা ও অস্থির চাপের সৃষ্টি হয়েছে। দেশের
অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি পণ্য রপ্তানি আয় ধারাবাহিকভাবে হ্রাস পেলেও
আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেল ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের আকাশচুম্বী দামের কারণে
আমদানি ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে চলেছে। এর ফলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর নতুন
করে বড় ধরনের টান পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর সাম্প্রতিক
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত কয়েক মাস ধরেই রপ্তানি আয়ে নেতিবাচক ধারা লক্ষ্য করা
যাচ্ছে, যার চরম বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে সদ্য সমাপ্ত মার্চ মাসে।
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম আট মাসের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, দেশের পণ্য
বাণিজ্যে ঘাটতি এক উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী,
এই সময়ে বাণিজ্য ঘাটতি প্রায় ১৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের কাছাকাছি পৌঁছেছে, যা দেশীয়
মুদ্রায় ২ লাখ কোটি টাকারও বেশি। রপ্তানি আয়ের তুলনায় আমদানি ব্যয় কয়েক গুণ বেশি
হওয়া এবং বিশ্ববাজারে খাদ্য ও জ্বালানির অস্থিতিশীল বাজার এই বিশাল ঘাটতির প্রধান
কারণ। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের সরবরাহ
ব্যবস্থা চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়ায় বাংলাদেশকে আগের চেয়ে অনেক বেশি দামে জ্বালানি
আমদানি করতে হচ্ছে, যা সরাসরি বৈদেশিক মুদ্রার মজুদের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে।
রপ্তানি আয়ের চিত্র পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, মার্চ মাসে রপ্তানিতে বড় ধরনের
বিপর্যয় নেমে এসেছে। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় এ মাসে রপ্তানি কমেছে প্রায় ১৮
দশমিক ৭ শতাংশ। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্যমতে মার্চে রপ্তানি হয়েছে ৩৪৮ কোটি
ডলার, যেখানে আগের বছরের এই সময়ে রপ্তানির পরিমাণ ছিল প্রায় ৪২৫ কোটি ডলার। এই
পতনের পেছনে প্রধান পাঁচটি খাত—তৈরি পোশাক, চামড়া, প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্য, হোম
টেক্সটাইল এবং পাটজাত পণ্যের দুর্বল পারফরম্যান্সকে দায়ী করা হচ্ছে। অর্থবছরের
প্রথম মাস জুলাইয়ে প্রবৃদ্ধি দেখা গেলেও এরপর টানা সাত মাস রপ্তানি আয়ে নেতিবাচক
প্রবৃদ্ধি দেশের বাণিজ্যিক সক্ষমতাকে প্রশ্নের মুখে ঠেলে দিয়েছে।
অন্যদিকে, রমজান ও ঈদকে কেন্দ্র করে ফেব্রুয়ারি ও মার্চ মাসে চিনি, ভোজ্যতেল, ছোলা
ও ডালের মতো নিত্যপণ্যের আমদানি বেড়ে যাওয়ায় সামগ্রিক আমদানি ব্যয় ৫ দশমিক ৬ শতাংশ
বৃদ্ধি পেয়েছে। জুলাই থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দেশের মোট আমদানি দাঁড়িয়েছে ৪৬ দশমিক
১৪ বিলিয়ন ডলারে, যেখানে রপ্তানি আয় হয়েছে মাত্র ৩০ বিলিয়ন ডলারের কিছু বেশি।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বিশ্ববাজারে সারের মূল্যবৃদ্ধি এবং উচ্চমূল্যে ভোগ্যপণ্য
আমদানির কারণে বাণিজ্য ঘাটতির এই ব্যবধান গত এক বছরের ব্যবধানে ৩ বিলিয়ন ডলারের
বেশি বেড়েছে। রপ্তানি আয়ের শ্লথগতি এবং আমদানির উচ্চমূল্য মূলত এই দ্বিমুখী সংকটের
মূল কারণ।
বাণিজ্যিক এই নাজুক পরিস্থিতির মধ্যেও আশার আলো দেখাচ্ছে প্রবাসীদের পাঠানো আয় বা
রেমিট্যান্স। শক্তিশালী রেমিট্যান্স প্রবাহের কারণে দেশের চলতি হিসাবের ঘাটতি
অনেকটা সহনীয় পর্যায়ে রয়েছে। জুলাই থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দেশে প্রায় সাড়ে ২২
বিলিয়ন ডলারের রেমিট্যান্স এসেছে, যা আগের বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বেশি।
এমনকি এপ্রিলের প্রথম আট দিনেই প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার প্রবাসী আয় দেশে আসার তথ্য
পাওয়া গেছে। শক্তিশালী এই প্রবাহ না থাকলে দেশের লেনদেনের ভারসাম্যে আরও বড় ধরনের
বিপর্যয় ঘটতে পারত। পাশাপাশি আর্থিক হিসাবেও ৪ বিলিয়ন ডলারের বেশি উদ্বৃত্ত থাকায়
এবং রপ্তানির বকেয়া অর্থ দেশে ফিরে আসায় বৈদেশিক মুদ্রার বাজার বর্তমানে স্থিতিশীল
রয়েছে।
বর্তমানে দেশের মোট বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩৪ দশমিক ৬৪ বিলিয়ন ডলারে অবস্থান করছে
এবং আইএমএফ-এর বিপিএম-৬ পদ্ধতি অনুযায়ী ব্যবহারযোগ্য রিজার্ভের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৯
দশমিক ৯৫ বিলিয়ন ডলারে। যদিও রেমিট্যান্সের কল্যাণে রিজার্ভ এখন পর্যন্ত সন্তোষজনক
অবস্থায় রয়েছে, তবুও দীর্ঘমেয়াদে এই স্বস্তি বজায় রাখা কঠিন হতে পারে বলে মনে করছেন
বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের মতে, বৈশ্বিক অস্থিরতা মোকাবিলা করে অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখতে
হলে কেবল রেমিট্যান্সের ওপর ভরসা না করে রপ্তানি পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়ানো এবং
জ্বালানি আমদানিতে বিকল্প ও সাশ্রয়ী উৎস খুঁজে বের করা অত্যন্ত জরুরি। অন্যথায়
আমদানির ক্রমবর্ধমান চাপ ভবিষ্যতে বড় ধরনের অর্থনৈতিক ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়াতে
পারে।





