মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী উত্তেজনা প্রশমনের লক্ষ্যে পাকিস্তানের ইসলামাবাদে
আয়োজিত যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার উচ্চপর্যায়ের সরাসরি আলোচনা কোনো সুনির্দিষ্ট
সমঝোতা ছাড়াই শেষ হয়েছে। টানা ২১ ঘণ্টা ধরে চলা এই ম্যারাথন বৈঠকের পর মার্কিন ভাইস
প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স দাবি করেছেন যে, ইরান তার বিতর্কিত পারমাণবিক প্রকল্প
নিয়ে কোনো ধরণের অর্থবহ চুক্তিতে পৌঁছাতে আগ্রহী নয়। রোববারের এই ব্রিফিংয়ে ভ্যান্স
সরাসরি অভিযোগ করেন যে, তেহরানের পক্ষ থেকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি না করার বিষয়ে যে
ধরণের দীর্ঘমেয়াদী ও জোরালো অঙ্গীকারের প্রয়োজন ছিল, তার অভাব এই সংলাপ ব্যর্থ
হওয়ার প্রধান কারণ।
জে ডি ভ্যান্স তাঁর বক্তব্যে আলোচনার মূল বিষয়বস্তু তুলে ধরে জানান, ওয়াশিংটনের
পক্ষ থেকে ইরানের কাছে একটি ইতিবাচক এবং পরিষ্কার অঙ্গীকার চাওয়া হয়েছিল।
যুক্তরাষ্ট্র চেয়েছিল ইরান যেন ভবিষ্যতে কখনো পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির পথে না হাঁটে
এবং এমন কোনো উপকরণ বা প্রযুক্তি অনুসন্ধান না করে, যা তাদের দ্রুত পারমাণবিক শক্তি
অর্জনের সক্ষমতা জোগাবে। তবে দীর্ঘ আলোচনার পরও ইরানের প্রতিনিধিদের মধ্যে এ ধরণের
কোনো মৌলিক ইচ্ছাশক্তি খুঁজে পাওয়া যায়নি বলে দাবি করেন তিনি। ভ্যান্স আরও উল্লেখ
করেন যে, ইরান কেবল স্বল্পমেয়াদী সুবিধার কথা ভাবছে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদী নিরাপত্তার
প্রশ্নে তাদের অবস্থান এখনো ধোঁয়াশাচ্ছন্ন।
ইরানের পারমাণবিক প্রকল্প এবং ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে পশ্চিমা বিশ্বের
সাথে তেহরানের এই বৈরিতা গত দুই দশকের এক জটিল সংকট। এই সমস্যার কূটনৈতিক সমাধানের
সর্বশেষ বড় প্রচেষ্টাটি শুরু হয়েছিল গত ৬ ফেব্রুয়ারি। টানা ২১ দিন ধরে চলা সেই
সংলাপ কোনো সমঝোতা চুক্তি ছাড়াই গত ২৭ ফেব্রুয়ারি শেষ হয়। সংলাপের সেই ব্যর্থতার
ঠিক পরদিন অর্থাৎ ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ইরানের ওপর ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ নামে এক
বিশাল সামরিক অভিযান শুরু করে যুক্তরাষ্ট্রের সশস্ত্র বাহিনী। একই সময়ে ওয়াশিংটনের
সাথে সমন্বয় করে ‘অপারেশন রোয়ারিং লায়ন’ নামে ইরানে সামরিক আগ্রাসন শুরু করে
ইসরায়েলও।
টানা এক মাসেরও বেশি সময় ধরে চলা রক্তক্ষয়ী সামরিক সংঘাতের পর পুনরায় কূটনীতির পথ
প্রশস্ত করতে গত ৭ এপ্রিল দুই দেশ সাময়িক যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করে। সেই বিরতিকালের
মধ্যেই গতকাল ১১ এপ্রিল ইসলামাবাদে পুনরায় সংলাপে বসেছিল দুই দেশের সরকারি
প্রতিনিধিদল। কিন্তু দীর্ঘ ২১ ঘণ্টার আলোচনার শেষে জে ডি ভ্যান্সের এই নিরাশাজনক
বক্তব্য মূলত প্রমাণ করে যে, দুই দেশের মধ্যকার আস্থার সংকট এখনো চরম পর্যায়ে
রয়েছে।
আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ইসলামাবাদের এই সংলাপ ব্যর্থ হওয়ার ফলে
মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতা পুনরায় বড় ধরণের ঝুঁকির মুখে পড়ল। পারমাণবিক ইস্যুতে
ইরানের অনড় অবস্থান এবং যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর নীতি সংঘাতের মাত্রা আরও বাড়িয়ে দিতে
পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। আপাতত সাময়িক যুদ্ধবিরতি চললেও, স্থায়ী শান্তি চুক্তির
কোনো লক্ষণ না থাকায় পুরো বিশ্ব এখন গভীর উদ্বেগের সাথে তেহরান ও ওয়াশিংটনের
পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে নজর রাখছে। ভ্যান্স তাঁর ব্রিফিংয়ের শেষে ভবিষ্যতে কোনো
পরিবর্তনের আশা রাখলেও, বর্তমান বাস্তবতা যুদ্ধের দামামাকেই পুনরায় ইঙ্গিত করছে।





