আসন্ন ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার আগেই মাঠের লড়াই ছাপিয়ে এখন আলোচনার কেন্দ্রে
উঠে এসেছে বড় ধরনের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক বিতর্ক। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও
ইসরায়েলের সাথে ইরানের চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে তৈরি হওয়া নিরাপত্তা ঝুঁকিকে
কেন্দ্র করে ফিফার ওপর এক ধরণের চাপ সৃষ্টি হয়েছিল। তবে সব জল্পনা-কল্পনার অবসান
ঘটিয়ে ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে যে, ইরানকে তাঁদের
নির্ধারিত সব ম্যাচ যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতেই খেলতে হবে। ভেন্যু পরিবর্তনের জন্য
ইরানের করা আবেদনটি ফিফা আনুষ্ঠানিকভাবে নাকচ করে দেওয়ায় মধ্যপ্রাচ্যের এই দেশটি
এখন এক কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।
ঘটনার প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণে জানা যায়, ইরানের ফুটবল ফেডারেশন রাজনৈতিক অস্থিরতা ও
খেলোয়াড়দের ব্যক্তিগত নিরাপত্তার অজুহাত দেখিয়ে তাদের গ্রুপ পর্বের ম্যাচগুলো
যুক্তরাষ্ট্র থেকে সরিয়ে প্রতিবেশী দেশ মেক্সিকোতে স্থানান্তরের জন্য ফিফার কাছে
জোরালো অনুরোধ জানিয়েছিল। তবে মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট ক্লডিয়া শিনবাম সম্প্রতি এক
সংবাদ সম্মেলনে নিশ্চিত করেছেন যে, ফুটবলের সর্বোচ্চ সংস্থা এই আবেদনটি গ্রহণ
করেনি। ফিফার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, বর্তমানে টুর্নামেন্টের যে পর্যায় রয়েছে,
সেখানে লজিস্টিক বা কৌশলগত কোনো কারণেই ভেন্যু পরিবর্তন করা সম্ভব নয়। ফলে
পূর্বনির্ধারিত সূচি অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্রের নির্ধারিত স্টেডিয়ামগুলোতেই ইরানের
ম্যাচগুলো অনুষ্ঠিত হবে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে শুরু হওয়া সরাসরি যুদ্ধ দুই
দেশের সম্পর্ককে এক ঐতিহাসিক নিম্নবিন্দুতে নিয়ে গেছে। এই তিক্ততা আরও বৃদ্ধি পায়
যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি বিতর্কিত
পোস্ট করেন। সেখানে তিনি উল্লেখ করেছিলেন যে, বর্তমান পরিস্থিতিতে ইরানি খেলোয়াড়দের
নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে তাঁদের বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া থেকে বিরত থাকা উচিত।
ট্রাম্পের এই প্রচ্ছন্ন হুমকির পর ইরান ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি মেহেদী তাজ অত্যন্ত
কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেন। তিনি সাফ জানিয়ে দেন যে, খেলোয়াড়দের জানমালের শতভাগ
নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত ইরান যুক্তরাষ্ট্রে খেলতে যাবে না। এমনকি ইরানের
ক্রীড়ামন্ত্রীও বিশ্বকাপে তাঁদের অংশগ্রহণ নিয়ে গভীর অনিশ্চয়তা প্রকাশ করেছিলেন।
ইরানের পক্ষ থেকে আসা এই বয়কট হুমকির মুখে পরিস্থিতি সামাল দিতে ফিফা সভাপতি
জিয়ান্নি ইনফান্তিনো নিজে উদ্যোগী হন। তিনি গত ৩১ মার্চ তুরস্কে ইরানি
কর্মকর্তাদের সঙ্গে এক বিশেষ বৈঠকে মিলিত হন। বৈঠকে ইনফান্তিনো স্পষ্ট করে বলেন যে,
ফুটবলকে সবসময় রাজনীতির ঊর্ধ্বে রাখা উচিত এবং ইরানকে অবশ্যই নির্ধারিত ভেন্যুতেই
খেলতে হবে। তিনি আশ্বস্ত করেছেন যে, অংশগ্রহণকারী প্রতিটি দেশের খেলোয়াড় ও
কর্মকর্তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ফিফা এবং আয়োজক দেশের প্রধান দায়িত্ব। তাঁর এই
অনমনীয় অবস্থানের পর ইরানের সামনে এখন নির্ধারিত সূচি মেনে নেওয়া ছাড়া আর কোনো
বিকল্প পথ খোলা নেই।
২০২৬ বিশ্বকাপে ইরান ‘জি’ গ্রুপে জায়গা পেয়েছে, যেখানে তাঁদের প্রতিপক্ষ হিসেবে
রয়েছে শক্তিশালী বেলজিয়াম, মিশর এবং নিউজিল্যান্ড। সূচি অনুযায়ী ইরানের সবগুলো
ম্যাচ যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিম উপকূলীয় অঞ্চলগুলোতে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
রাজনৈতিক বৈরিতা আর যুদ্ধের দামামার মাঝে ক্রীড়াঙ্গনের এই সংকট শেষ পর্যন্ত কোন
দিকে মোড় নেয়, এখন সেটিই দেখার বিষয়। ক্রীড়া বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ফিফার এই কঠোর
সিদ্ধান্ত বিশ্ব ফুটবলের সার্বভৌমত্ব রক্ষার একটি চেষ্টা হলেও, মাঠের লড়াইয়ে এর
প্রভাব কতটা পড়বে তা নিয়ে সংশয় থেকেই যাচ্ছে। আপাতত ইরানকে তাদের বিশ্বকাপ মিশনের
জন্য যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে পা রাখা ছাড়া গত্যন্তর নেই।





