রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার বিস্তীর্ণ চরাঞ্চল দীর্ঘদিন ধরে উত্তরাঞ্চলের অন্যতম প্রধান নদী তিস্তার দুই বিপরীত রূপের মধ্যে পড়ে রয়েছেন। শুষ্ক মৌসুমে নদী হয়ে যায় ধূধূ বালুচরে, যেখানে পানির অভাবে জেলেরা মাছ ধরা থেকে বঞ্চিত হন ও কৃষকরা সেচের অভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন। অন্যদিকে বর্ষায় এই নদী হয়ে ওঠে ভয়ঙ্কর ব্যাধি, অপ্রত্যাশিত বন্যা ও নদীভাঙনের মাধ্যমে বহু গ্রাম ও বসতভিটা ধ্বংসের মুখে পড়ে। এই পরিস্থিতি বছরের পর বছর ধরে লক্ষাধিক মানুষকে দুর্ভোগের মধ্যে রাখছে। নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হওয়া, বসতভিটা ভাঙা ও জীবিকার অনিশ্চয়তা তাদের জীবনকে করে তুলেছে অস্থির।
বিশেষ করে নোহালী ইউনিয়নের মিনার বাজার থেকে লক্ষ্মীটারী ইউনিয়নের মহিপুর পর্যন্ত প্রায় ১০ কিলোমিটার এলাকা নদীতীরবর্তী গ্রামগুলো—আনন্দবাজার, বাগডহরা, মটুকপুর, বিনবিনা, ইচলি, শংকরদহ ও কাশিয়াবাড়িসহ চরছালাপাক চরম ঝুঁকিতে আছে। শুষ্ক মৌসুমে নদীর পানি কমে যাওয়ার কারণে অনেক জায়গায় নদী শুকিয়ে বালুচরে পরিণত হয়, ফলে নদীর পরিবেশগত ভারসাম্য নষ্ট হয়। নদীতে পানি না থাকায় নৌচলাচল বন্ধ হয়ে যায়, মাছের উৎপাদন কমে যায়, এবং মাছের ব্যবসায়ী ও জেলেরাও কর্মহীন হয়ে পড়ছেন। কৃষকরাও সেচের সংকটে পড়ে তাদের ফসলের উৎপাদন কমে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন।
বর্ষার সময় তিস্তা নদীর পানির উচ্চতা হঠাৎ বৃদ্ধি পেয়ে ভয়ঙ্কর বন্যা ও নদীভাঙনের ঘটনা ঘটায়, ঘরবাড়ি, স্কুল, রাস্তা ও ফসলি জমি নদীর গর্ভে চলে যায়। শতশত পরিবার প্রতি বছর বাস্তুচ্যুত হচ্ছে, কেউ পরিবারের আশ্রয় হারাচ্ছেন, কেউ বা জীবিকার শেষ অবলম্বন ফিরে পাচ্ছেন না। প্রবীণ আলতাফ হোসেন বলেন, আমার সত্তর বছর জীবনে তিস্তার ভাঙন আর বন্যা দেখে এসেছি। ছোটবেলা থেকে আজ পর্যন্ত সব সময় শুষ্ক মৌসুমে পানি নাই, বর্ষায় সব কিছু ভেসে যায়। বহু সরকার এসেছে, কত প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, কিন্তু কেউই স্থায়ী সমাধান করতে পারেনি। তিনি এখন শুধই চান, একটি বাঁধ নির্মাণ হোক, যেন তার পরবর্তী প্রজন্মের জন্য কিছু শান্তির যুগ আসতে পারে।
শফিকুল (৪৫) বলেন, আমি ছোটবেলা থেকে তিস্তার ভাঙন দেখে আসছি। আমার বাবা অনেকবার বাড়ি সরাতে হয়েছে। প্রতিবার নতুন করে গড়েছি আবার নদী এসে তা ভেঙে দিয়েছে। এই ভাঙনের আতংকে আমরা জীবন কাটাচ্ছি, অনেক প্রতিবেশী অন্য এলাকায় চলে গেছে। যদি কোনও স্থায়ী বাঁধ থাকত, তবে অন্তত আমরা নিরাপদ থাকতে পারতাম।
আনন্দবাজার এলাকার স্নাতক শিক্ষার্থী আল-আমিন বলেন, শুকনো মৌসুমে নদীর পার হয়ে হেঁটে কলেজে যেতে হয়। কিন্তু বর্ষায় নৌকা ছাড়া যাতায়াত করুন সম্ভব নয়, এতে আমাদের পড়াশোনা অনেক সময় ব্যহত হয়। অন্যদিকে ইচলি গ্রামের স্কুলছাত্রী রিমা আক্তার জানায়, আমাদের স্কুল নদীতে ভেঙে গেছে, এখন দূর স্থানে গিয়ে পড়াশোনা করতে হয়। বর্ষার সময় রাস্তা ভেঙে গেলে স্কুলে যাওয়া অসম্ভব হয়ে পড়ে।
স্থানীয় আশঙ্কা, ভাঙন ও বন্যার ফলে এখানে কোনো স্থায়ী উন্নয়ন হয় না। প্রতি বছর বরাদ্দ আসলেও তা দীর্ঘস্থায়ী সমাধানে রূপ নেয় না। বর্ষার বরাদ্দের প্রায় সবটাই ভেসে যায়, ফলে উন্নয়ন প্রকল্পগুলো সম্পন্ন হয় না। একমাত্র স্থায়ী সমাধান হিসেবে মনোনীত হয়েছে মিনার বাজার থেকে মহিপুর পর্যন্ত একটি নদীতীর রক্ষা বাঁধ নির্মাণ।
কৃষক আব্দুল মান্নান বলেন, আমরা ত্রাণ চাই না, চাই একটি বাঁধের আশ্বাস। এতে আমরা নিজে চলাফেরা করতে পারবো ও আমাদের জীবিকা স্থায়ী হবে।
গঙ্গাচড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জেসমিন আক্তার বলেন, এই উপজেলার তিস্তার তীরবর্তী চরাঞ্চলের মানুষের জীবন ও নিরাপত্তা আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। আমরা মাঠ পর্যায়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেছি এবং স্থানীয় জনতার সমস্যাগুলো গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে তাদের দুর্ভোগ লাঘবের জন্য কাজ করে যাচ্ছি। সরকারের পক্ষ থেকে স্বল্পমেয়াদি উদ্যোগের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই সমাধান খুঁজে বের করার জন্য বিভিন্ন দপ্তরের সঙ্গে আলোচনা চলমান। বিশেষ করে নদীতীর রক্ষা, যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নয়ন ও ভাঙনপ্রবণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করে একটি সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণের কাজ শুরু হয়েছে।
তিস্তার শুষ্ক মৌসুমের পানি শূন্যতা ও বর্ষার ভয়াবহ বন্যার বিষয় দুটি একসঙ্গে দেখা যাচ্ছে এই অঞ্চলে। গঙ্গাচড়ার মানুষ এখন এককথায় অপেক্ষায় একটি স্থায়ী সমাধানের। তাদের বিশ্বাস, যদি একটি শক্তিশালী বাঁধ নির্মাণ করা যায়, তবে এখানকার চিত্র বদলে যাবে। তারা আশা করেন, সেই সমাধান তাদের জীবন ও সুখ-শান্তির জন্য নতুন সূচনা এনে দেবে।





