গত ১৩ এপ্রিল ইরানি বন্দরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের নৌঅবরোধ শুরু হয়। এরপর যুক্তরাষ্ট্র
হরমুজ প্রণালীর কাছে ইরানের পতাকাবাহী একটি ট্যাংকারে গুলি চালিয়ে তা জব্দ করে এবং
গভীর সমুদ্রে ইরানগামী বা ইরান থেকে আসা জাহাজগুলোকে পথ বদলাতে নির্দেশ দেয়। ইরানের
সশস্ত্র বাহিনী একে ‘জলদস্যুতার শামিল’ এবং ‘বেআইনি কাজ’ বলে আখ্যা দিয়েছে।
মার্কিন নৌঅবরোধের জবাবে ইরান সব বিদেশি জাহাজের জন্য হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে
দিয়েছে এবং কয়েকটি বিদেশি পতাকাবাহী জাহাজ জব্দও করেছে। এর আগে তারা কেবল নিজেদের
জন্য ‘বন্ধুভাবাপন্ন’ দেশের জাহাজগুলোকে ওই পথে চলার অনুমতি দিত।
১৯ এপ্রিল ইরানের প্রথম ভাইস প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ রেজা আরেফ সামাজিক মাধ্যম এক্সে
বলেন, ‘হরমুজ প্রণালীর নিরাপত্তা বিনা মূল্যে মেলে না।’ তিনি লেখেন, ‘একদিকে ইরানের
তেল রপ্তানি সীমিত করা হবে, আর অন্যদিকে সবার জন্য বিনা মূল্যে নিরাপত্তা আশা করা
হবে—এমনটা হতে পারে না। পছন্দটা একদম পরিষ্কার: হয় সবার জন্য উন্মুক্ত তেলের বাজার,
না হয় সবার জন্য বড় ধরনের ক্ষতির ঝুঁকি।’
তিনি আরও বলেন, ‘জ্বালানির বৈশ্বিক বাজারে স্থিতিশীলতা নির্ভর করছে ইরান ও এর
মিত্রদের ওপর অর্থনৈতিক ও সামরিক চাপের নিশ্চিত ও স্থায়ী অবসানের ওপর।’ বৃহস্পতিবার
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বিবৃতিতে ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার এবং
যুদ্ধবিরতি আলোচনার প্রধান মধ্যস্থতাকারী মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ বলেন,
যুক্তরাষ্ট্রের নৌঅবরোধ তুলে নেওয়া হলেই কেবল পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধবিরতি কার্যকর হতে
পারে।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, এই অবরোধ ইরানের বেশ ক্ষতি করছে ঠিকই, তবে এই পরিস্থিতি সামাল
দেওয়ার মতো অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সদিচ্ছা দেশটির রয়েছে।
মার্কিন অবরোধে কতটা ক্ষতি হচ্ছে ইরানের?
ইরান সমুদ্রপথে তেল, গ্যাস, পেট্রোকেমিক্যাল, প্লাস্টিক ও কৃষিপণ্যসহ বিভিন্ন পণ্য
রপ্তানি করে। বিশ্লেষকেরা বলছেন, হরমুজ প্রণালীসহ ইরানি বন্দরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের
নৌঅবরোধ এই বাণিজ্যে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধ শুরুর পরপরই তেহরান কার্যত
হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেয়। এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ায়
বিশ্ববাজারে তেল ও গ্যাসের দাম হু হু করে বাড়তে থাকে। এরপর থেকে হরমুজ প্রণালীর
নিয়ন্ত্রণ ইরানের হাতেই রয়েছে। তবে এই পথ দিয়ে তারা নিজেদের জ্বালানি পণ্য রপ্তানি
চালিয়ে গেছে।
ইরানের মোট তেল রপ্তানির প্রায় ৮০ শতাংশই যায় হরমুজ প্রণালি দিয়ে। বাণিজ্য ও তথ্য
বিশ্লেষক সংস্থা কেপলারের মতে, ইরান গত মার্চে প্রতিদিন গড়ে ১ দশমিক ৮৪ মিলিয়ন
ব্যারেল অপরিশোধিত তেল রপ্তানি করেছে। এপ্রিলে এখন পর্যন্ত প্রতিদিন গড়ে ১ দশমিক ৭১
মিলিয়ন ব্যারেল তেল পাঠিয়েছে তারা। ২০২৫ সালে তাদের গড় রপ্তানি ছিল দিনে ১ দশমিক ৬৮
মিলিয়ন ব্যারেল।
গত ১৫ মার্চ থেকে ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত ইরান ৫৫ দশমিক ২২ মিলিয়ন ব্যারেলের বেশি তেল
রপ্তানি করেছে। গত এক মাসে ইরানের তিন ধরনের প্রধান তেলের (ইরানিয়ান লাইট,
ইরানিয়ান হেভি এবং ফোরোজান ব্লেন্ড) দাম কোনো দিনই ব্যারেলপ্রতি ৯০ ডলারের নিচে
নামেনি। অনেক দিন এই দাম ১০০ ডলারও ছাড়িয়ে গেছে।
এমনকি ব্যারেলপ্রতি ৯০ ডলারের হিসাব ধরলেও, চলমান তেল রপ্তানি থেকে গত এক মাসে ইরান
অন্তত ৪ দশমিক ৯৭ বিলিয়ন ডলার আয় করেছে। এর বিপরীতে, যুদ্ধ শুরুর আগে ফেব্রুয়ারির
শুরুতে ইরান তেল রপ্তানি থেকে দিনে প্রায় ১১৫ মিলিয়ন ডলার আয় করত, যা মাসে দাঁড়ায় ৩
দশমিক ৪৫ বিলিয়ন ডলার।
সহজ কথায়, যুদ্ধ শুরুর আগের তুলনায় গত এক মাসে তেল রপ্তানি থেকে ইরান ৪০ শতাংশ বেশি
আয় করেছে। আর এই আয় বন্ধ করাই ইরানি বন্দরগুলোতে মার্কিন নৌঅবরোধের অন্যতম প্রধান
কারণ।
মিডল ইস্ট কাউন্সিল অন গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্সের জ্যেষ্ঠ ফেলো ফ্রেডেরিক স্নাইডার ১৪
এপ্রিল আল জাজিরাকে জানান, গত ছয় সপ্তাহে তেল রাজস্বের দিক থেকে ইরান লাভবান হয়েছে।
কিন্তু মার্কিন অবরোধের কারণে সেই পরিস্থিতি পাল্টে যাবে।
যুক্তরাষ্ট্র কি দীর্ঘদিন অবরোধ চালিয়ে যেতে পারবে?
স্নাইডার জানান, আগামী ১ মে একটি আইনি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বেন ট্রাম্প। কারণ,
কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া বিদেশে কোনো সামরিক অভিযান চালানোর জন্য তার হাতে থাকা ৬০
দিনের সময়সীমা ওই দিন শেষ হবে।
তিনি জানান, যেসব জাহাজের মাধ্যমে এই অবরোধ কার্যকর রাখা হচ্ছে, সেগুলোর অবস্থা খুব
একটা ভালো নয়। এ ছাড়া চীনের পণ্য বহনকারী জাহাজগুলো যদি যুক্তরাষ্ট্র বারবার জব্দ
করতে থাকে, তবে চীন কেমন প্রতিক্রিয়া দেখাবে, সেটাও দেখার বিষয়।
স্নাইডার বলেন, ‘চীন ইতোমধ্যেই জানিয়েছে যে ইরানের সঙ্গে তাদের বাণিজ্যে অবরোধ
কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এর পাশাপাশি প্রতিশোধ হিসেবে ইরানের হরমুজ প্রণালী বন্ধ
রাখার সিদ্ধান্ত যুক্তরাষ্ট্রের খুব একটা ক্ষতি না করলেও, এই অঞ্চলে ও বিশ্বজুড়ে
থাকা মার্কিন মিত্রদের ক্ষতি করছে। ফলে ট্রাম্পের ওপর চাপ আরও বাড়ছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘দুই পক্ষের আচরণ থেকে যদি কিছু বোঝার থাকে, তবে তা হলো—ইরান
ধৈর্যের পরিচয় দিচ্ছে, আর ট্রাম্প ক্রমশ অধৈর্য হয়ে পড়ছেন।’
বাহরাইনে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক রাষ্ট্রদূত অ্যাডাম এরেলি আল জাজিরার ‘দিস
ইজ আমেরিকা’ অনুষ্ঠানে বলেন, ‘ইরানিরা এই পরিস্থিতির জন্য আগে থেকেই প্রস্তুত ছিল।
তাদের নিজেদের পরিকল্পনা আছে। তেল মজুত বা বিক্রি করার বিকল্প উপায়ও তাদের হাতে
আছে।’ তিনি বলেন, ‘এমনকি তাদের তেল ফুরিয়ে গেলেও, এই কঠোর অবরোধ ও নিষেধাজ্ঞার
মধ্যেও টিকে থাকার পথ তাদের জানা আছে। সত্যি বলতে, আমার মনে হয় ট্রাম্প এবং
আমেরিকান জনগণের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেলেও ইরানিরা ঠিকই টিকে থাকবে।’





