রবিবার, ১৭ই মে, ২০২৬, ৩রা জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩

হরমুজ প্রণালী ইস্যুতে সংকটে ওমান

মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি এবার

নতুন মোড় নিয়েছে। কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালীর ভবিষ্যৎ

নিয়ন্ত্রণ এবং এর মধ্য দিয়ে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর ওপর ইরানের টোল আরোপের

পরিকল্পনাকে কেন্দ্র করে নতুন সংকটে পড়েছে ওমান।

বিশ্বের মোট সমুদ্রবাহিত জ্বালানি তেলের এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হয় এই হরমুজ প্রণালী

দিয়ে। গত ফেব্রুয়ারিতে ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার পর থেকে

দীর্ঘ ১০ সপ্তাহ ধরে এই নৌপথটি কার্যত অবরুদ্ধ হয়ে আছে। এই প্রণালির দক্ষিণ দিকে

ওমানের একটি বিচ্ছিন্ন ভূখণ্ড ‘মুসান্দাম’ অবস্থিত হওয়ায় এই সংকটে অবধারিতভাবেই

জড়িয়ে পড়েছে দেশটি।

গত শুক্রবার ভারতে এক বক্তৃতায় ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি দাবি করেন,

হরমুজ প্রণালী সম্পূর্ণভাবে ওমান ও ইরানের নিজস্ব জলপথ। তিনি বলেন, ‘এই প্রণালী

ইরান ও ওমানের আঞ্চলিক জলসীমার মধ্যে অবস্থিত। এর মধ্যে কোনো আন্তর্জাতিক জলসীমা

নেই।’

আরাগচি আরও জানান, এই প্রণালির ভবিষ্যৎ ব্যবস্থাপনার বিষয়ে ইরান ওমানের সঙ্গে

সমন্বয় করছে। তবে ইরানের এই একতরফা পরিকল্পনার ব্যাপারে এখন পর্যন্ত রহস্যজনকভাবে

নীরব রয়েছে ওমান।

পশ্চিমা কূটনীতিকদের মতে, ইরানের এই প্রস্তাব আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থি। এর

মাধ্যমে ইরান নিজের ইচ্ছামতো যে কোনো দেশের জাহাজ আটকে দেওয়ার অধিকার পেয়ে যাবে।

তাছাড়া, টোল আদায়ের জন্য প্রতিটি জাহাজকে ইরানি মুদ্রা ‘রিয়াল’-এ অ্যাকাউন্ট খোলার

যে শর্ত দেওয়া হয়েছে, তা ইরানের বিপ্লবী গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) ওপর আরোপিত

জাতিসংঘ নিষেধাজ্ঞার সরাসরি লঙ্ঘন হতে পারে।

ইরানের এই একাধিপত্য ঠেকাতে ফ্রান্স এবং যুক্তরাজ্য মিলে ‘নৌচলাচলের স্বাধীনতা’

রক্ষার নীতিতে একটি পাল্টা পরিকল্পনা তৈরি করেছে, যা ওমানের কাছেও পেশ করা হয়েছে।

পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের অধিকাংশ দেশ এই পশ্চিমা পরিকল্পনাকে সমর্থন করছে।

বিষয়টি নিয়ে আলোচনার জন্য সম্প্রতি যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্র দপ্তরের রাজনৈতিক

পরিচালক লর্ড লেভেলিন এবং আন্তর্জাতিক মেরিটাইম অর্গানাইজেশনের (আইএমও) প্রধান

আর্সেনিও ডোমিঙ্গুয়েজ ওমানের রাজধানী মাসকাট সফর করেছেন। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী

ইরান এভাবে টোল আদায় করতে পারে কি না, তা নিয়েই এখন বিতর্ক চলছে।

ইরান ১৯৮২ সালে জাতিসংঘের সমুদ্র আইন বিষয়ক কনভেনশনে সই করলেও তা কখনো দেশটির সংসদে

পাস হয়নি। ফলে তেহরানের দাবি, তারা এই আইনের অবাধ যাতায়াতের নিয়ম মানতে বাধ্য নয়।

গত ৫ মে ইরান ‘পারসিয়ান গালফ স্ট্রেইট অথোরিটি’ (পিজিএসএ) নামে একটি নতুন সরকারি

সংস্থা গঠন করেছে, যার মূল লক্ষ্য এই প্রণালি থেকে বিপুল রাজস্ব আয় করা। নতুন নিয়ম

অনুযায়ী, প্রতি ব্যারেল তেলের সমপরিমাণ মূল্যের জন্য প্রায় এক ডলার করে টোল

নির্ধারণ করা হচ্ছে।

সম্প্রতি বেইজিং সফরে গিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছিলেন,

চীনও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একমত যে, হরমুজ প্রণালীতে কোনো ধরনের টোল বা নিষেধাজ্ঞা

আরোপ করা যাবে না। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও একই কথা বলেন।

তবে চীনের অবস্থান কিছুটা দ্বিমুখী। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই অচলাবস্থার জন্য

সরাসরি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধকে দায়ী করেছে।

এদিকে গত বৃহস্পতিবার ইরানের বিপ্লবী গার্ডস (আইআরজিসি) জানায়, তেহরানে নিযুক্ত

চীনা রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে বৈঠকের পর চীনের একঝাঁক তেলবাহী ট্যাংকারকে হরমুজ প্রণালী

পার হওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছে এবং এই জাহাজগুলো ইরানি নিয়ম মেনে চলতে রাজি হয়েছে।

তবে চীন আসলে কোনো টোল দিয়েছে কি না, তা স্পষ্ট করা হয়নি।

ডোনাল্ড ট্রাম্প এর আগে হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন, ‘যারা অবৈধভাবে ইরানকে টোল দিয়ে পার

হবে, আন্তর্জাতিক জলসীমায় তাদের নিরাপত্তার গ্যারান্টি দেওয়া হবে না।’ যা থেকে

স্পষ্ট যে, মার্কিন নৌবাহিনী প্রয়োজনে টোল দেওয়া চীনা জাহাজগুলোকে আটকে দিতে পারে।

পোস্টটি শেয়ার করুন