বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ৪৫তম শাহাদাতবার্ষিকী উপলক্ষে
তাঁর স্মৃতির প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম
আলমগীর। গভীর শ্রদ্ধাভরে এই মহান নেতাকে স্মরণ করে তিনি বলেন, ‘শহীদ জিয়ার
প্রদর্শিত পথ, দর্শন ও কর্মসূচি আমাদের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব সুসংহতকরণ, বহুদলীয়
গণতন্ত্র এবং দেশীয় উন্নয়ন ও অগ্রগতির রক্ষাকবচ। তার জীবনকালে স্বজাতির চরম
ক্রান্তিকালে জিয়াউর রহমান দেশ ও জনগণের পক্ষে অবস্থান গ্রহণ করেছেন।’
শুক্রবার (২৯ মে) গণমাধ্যমে পাঠানো এক বাণীতে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘চট্টগ্রামের
কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা, মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম
সেক্টর কমান্ডার ও জেড ফোর্সের অধিনায়ক জিয়াউর রহমান ইতিহাসের এক উজ্জ্বল অধ্যায়ে
জাতির ইতিহাসে এক বীর নায়কের স্থান অর্জন করেছেন। ২৬ মার্চ তার স্বাধীনতার ঘোষণার
অভয়মন্ত্রে দেশের তরুণ ছাত্র, শ্রমিক, যুবকসহ নানা স্তরের মানুষ যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে
পড়ে। ফলে হানাদার বাহিনীর ধ্বংসের শক্তি প্রতিহত করে দেশবাসী বিজয়ের দিকে ধাবিত হয়।
বিজয়ের পরে তৎকালীন শাসকগোষ্ঠীর অগণতান্ত্রিক দমনমূলক শাসন-শোষনের জাঁতাকলে দেশের
মানুষ ভয়াবহ অরাজকতার মধ্যে পতিত হয়। মানুষের নাগরিক অধিকারগুলো হরণ করা হয়,
গণতন্ত্রকে দেওয়া হয় কবর। নির্মম একদলীয় দুঃশাসন আইন করে চালু করা হয়। সংবাদপত্রের
স্বাধীনতাসহ মানুষের বাক ও চিন্তার স্বাধীনতাকে মুছে দেওয়া হয় স্বেচ্ছাচারী
আক্রমণে। একদলীয় প্রভুত্ববাদের অধীনতার নাগপাশে বন্দি করা হয় সারা জাতিকে।’
তৎকালীন অস্থির রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও জিয়ার মুক্তি প্রসঙ্গে তিনি উল্লেখ করেন,
‘নৈরাজ্যের সেই সময়ে সিপাহি ও জনতা মিলিত হয়ে রাজপথে গড়ে তোলে প্রবল প্রতিরোধ।
সিপাহি-জনতার মিলিত স্রোতে জিয়াউর রহমানকে বন্দিদশা থেকে মুক্তি করা হয়। জিয়াউর
রহমান জাতীয় রাজনীতির পাদপ্রদীপের আলোয় অভিসিক্ত হন। জিয়া রাষ্ট্রক্ষমতায় এসেই
ফিরিয়ে দেন বহুদলীয় গণতন্ত্র এবং সংবাদপত্রসহ নাগরিক স্বাধীনতা। গণতন্ত্রের
ঐতিহাসিক সার্থকতা নিশ্চিত করেন। শুরু করেন স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে উৎপাদনের
রাজনীতির মাধ্যমে দেশকে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করা। বাংলাদেশকে তলাবিহীন ঝুড়ির
আখ্যা থেকে খাদ্য রপ্তানিকারক দেশে পরিণত করেন। ব্যক্তিজীবনেও দুর্নীতি, মিথ্যা
প্রতিশ্রুতি ও সুবিধাবাদের কাছে আত্মসমর্পণকে তিনি ঘৃণা করতেন। তার অন্তর্গত
স্বচ্ছতা তাকে দিয়েছে এক অনন্য ঈর্ষণীয় উচ্চতা। তার অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংস্কারের
কারণেই বাংলাদেশে বহুদলীয় গণতন্ত্রের পথচলা শুরু হয় এবং অর্থনীতি মজবুত ভিত্তির ওপর
প্রতিষ্ঠিত হয়।’
জিয়াউর রহমানের মর্মান্তিক শাহাদাত ও তাঁর উত্তরাধিকার নিয়ে বিএনপি মহাসচিব বলেন,
‘এই মহান জাতীয়তাবাদী নেতার জনপ্রিয়তা দেশি-বিদেশি চক্রান্তকারী শক্তি কখনোই মেনে
নিতে পারেনি। ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকেই দেশবিরোধী চক্র তার বিরুদ্ধে নীলনকশা আঁটতে
শুরু করে। এই চক্রান্তকারীরা ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামের সার্কিট হাউসে
রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে নির্মমভাবে হত্যা করে। এই মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের মধ্য
দিয়ে একজন মহান দেশপ্রেমিককে হারায় দেশবাসী। তবে চক্রান্তকারীরা যতই চেষ্টা করুক
কোনাে ক্ষণজন্মা রাষ্ট্রনায়ককে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দিলেই তিনি বিস্মৃত হন না বরং নিজ
দেশের জনগণের হৃদয়ে চিরজাগরূক হয়ে অবস্থান করেন। তার সহধর্মিণী বেগম খালেদা জিয়াও
আপসহীনতা নিয়ে শহীদ জিয়ার প্রদর্শিত পথ ধরেই বহুদলীয় গণতন্ত্র, দেশের উন্নয়নের
ধারাকে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন গণতন্ত্র ও দেশবিরোধী শক্তিকে মোকাবেলা করে। নিখাদ
দেশপ্রেমিক শহীদ জিয়াকে কখনো তার বিশ্বাস থেকে বিন্দুমাত্র টলানো যায়নি। তিনি সারা
জীবন আদর্শকে বুকে ধারণ করে নিরবচ্ছিন্নভাবে এগিয়ে গেছেন আধুনিক রাষ্ট্র
বিনির্মাণের পথে।’
বিগত শাসনামলের সমালোচনা ও ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘জনমনে ভয়
আর আতঙ্ক সৃষ্টি করে আওয়ামী ফ্যাসিবাদ দীর্ঘ ১৭ বছর ক্ষমতা আঁকড়ে রেখেছিল। জনগণের
ক্ষমতা কেড়ে নিয়ে বন্দি করেছিল ফ্যাসিবাদের কারাগারে। গুম, খুন, নির্যাতন ও জুলুম
ছিল পতিত ফ্যাসিবাদের ক্ষমতায় টিকে থাকার একমাত্র হাতিয়ার। দেশের সম্পদ বিদেশে
পাচার করে এক লুটেরা মাফিয়া অর্থনীতি প্রতিষ্ঠা করেছিল পরাজিত আওয়ামী ফ্যাসিস্ট
শাসকগোষ্ঠী। এ অবস্থায় অপরুদ্ধ গণতন্ত্র পুণরুদ্ধারে ছাত্র, শ্রমিক, জনতাসহ সব
গণতন্ত্রকামী মানুষ ঐক্যবদ্ধ হয়ে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পতন ঘটায়।
ছাত্র-জনতার রক্তের বিনিময়ে অর্জিত বিজয়কে এখন পূর্ণাঙ্গ রূপ দিতে হবে। অবাধ-সুষ্ঠু
নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে।’
ভবিষ্যৎ সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘তারেক
রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি জোট সরকার জনগণের কাছে জবাবদিহি, প্রতিটি ক্ষেত্রে
স্বচ্ছতা, পরমতসহিঞ্চুতাসহ সব নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করতে বদ্ধপরিকর। গণতন্ত্রকে
স্থীতিশীল ও স্থায়ী রূপ দেওয়ার জন্য রাষ্ট্রের গণতান্ত্রির প্রতিষ্ঠানগুলোকে
শক্তিশালী করতে হবে। জাতীয় জীবনের সব সংকট, সংগ্রাম ও বিনির্মাণে শহীদ জিয়ার
প্রদর্শিত পথ ও আদর্শ বুকে ধারণ করেই আমাদের সামনে এগিয়ে যেতে হবে এবং জাতীয়
স্বার্থ, বহুমাত্রিক গণতন্ত্র এবং জনগণের অধিকার সুরক্ষায় ইস্পাতকঠিন গণঐক্য গড়ে
তুলতে হবে।’ পরিশেষে শহীদ জিয়ার শাহাদাতবার্ষিকী যথাযথ মর্যাদায় পালনের জন্য দলীয়
নেতা-কর্মী ও দেশের সর্বস্তরের জনগণের প্রতি তিনি উদাত্ত আহ্বান জানান।





