দেশে একদিকে হাম নিয়ে চলছে ত্রাহি অবস্থা, আর এরই মধ্যে নতুন করে চোখ রাঙাতে শুরু
করেছে ডেঙ্গু। টানা কয়েক দিনের বৃষ্টিতে কিউলেক্স মশার উপদ্রব কিছুটা কমলেও, পাল্লা
দিয়ে বাড়ছে ডেঙ্গুর প্রধান বাহক এডিস মশা। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, এবার
ডেঙ্গুর ধরন ও বিস্তার বেশ জটিল আকার ধারণ করতে পারে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের গত পাঁচ বছরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, দেশে ডেঙ্গুতে মোট
মৃত্যুর প্রায় অর্ধেকই ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকার বাসিন্দা। এর
মধ্যে আবার দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় মৃত্যুর হার তুলনামূলকভাবে বেশি।
হাম উপসর্গে আরও ৩ শিশুর মৃত্যু, আক্রান্ত ১,১৩৪: দেশে হামের উপসর্গ নিয়ে নতুন করে
আরও তিন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে নতুন করে এই রোগে আক্রান্ত হয়েছেন আরও ১
হাজার ১৩৪ জন। সোমবার (০১ জুন) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রকাশিত দৈনিক বুলেটিনে এই
তথ্য জানানো হয়েছে।
এই নিয়ে গত ১৫ মার্চ থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত দেশে হাম ও এর উপসর্গে মোট ৫৮৮ জনের
মৃত্যু হলো। এর মধ্যে ল্যাব পরীক্ষায় নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে ৯০
জন শিশু। আর হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছে বাকি ৪৯৮ জন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানায়, রোববার (৩১ মে) সকাল ৮টা থেকে সোমবার সকাল ৮টা পর্যন্ত
পাওয়া তথ্যের ওপর ভিত্তি করেই এই পরিসংখ্যান প্রকাশ করা হয়েছে। এর আগে গত
বৃহস্পতিবার ও বুধবার পাঁচজন করে এবং গত মঙ্গলবার ১০ জনের মৃত্যুর তথ্য জানানো
হয়েছিল।
বুলেটিনে আরও উল্লেখ করা হয়, গত ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত পরীক্ষায় নিশ্চিতভাবে হামে
আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৯ হাজার ৯৪ জনে। একই সময়ে হামের উপসর্গ নিয়ে দেশের
বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন ৫৭ হাজার ৯০২ জন রোগী। তবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর
আশ্বস্ত করেছে যে, হামের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে তাদের নজরদারি ও চিকিৎসা কার্যক্রম
পুরোপুরি অব্যাহত রয়েছে।
হাসপাতালের বাস্তব চিত্র ও প্রাপ্তবয়স্কদের সংক্রমণ: গতকাল সোমবার বেলা দেড়টার দিকে
রাজধানীর মহাখালীর ডিএনসিসি কোভিড-১৯ ডেডিকেটেড হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, হামে
আক্রান্ত হয়ে বহু রোগী সেখানে চিকিৎসাধীন আছেন।
তাদেরই একজন শিল্পী আক্তার। তাঁর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কুমিল্লার ক্যান্টনমেন্ট
এলাকা থেকে গত ২৭ মে তারা এই হাসপাতালে এসেছেন। এর আগে গত ২২ মে অসুস্থ হন লিপি
আক্তার। প্রথমে পরিবারের কেউ হামের বিষয়টি বুঝতে পারেননি। সাধারণ জ্বর ও অন্যান্য
রোগ ভেবে তারা তিন দিন কুমিল্লার ময়নামতি জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসা নেন। কিন্তু
শারীরিক অবস্থার কোনো পরিবর্তন না দেখে পরে সেখান থেকে লিপিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ
হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়। ঢাকা মেডিকেল থেকে প্রথমে পাঠানো হয় মহাখালীর সংক্রামক
ব্যাধি হাসপাতালে এবং সেখান থেকে গত ২৯ মে তাকে স্থানান্তর করা হয় ডিএনসিসি
কোভিড-১৯ ডেডিকেটেড হাসপাতালে।
এখানে আনার পর লিপি আক্তারকে টানা চার দিন নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) রাখা
হয়েছিল। শারীরিক অবস্থার কিছুটা উন্নতি হওয়ার পর গত রোববার বিকেলে তাকে চতুর্থ তলার
সাধারণ ওয়ার্ডে দেওয়া হয়। আইসিইউতে থাকার সময়টা প্রচণ্ড দুশ্চিন্তায় কেটেছে জানিয়ে
লিপি আক্তার বলেন, ‘কখনো এ রকম হাম হবে ভাবি নাই। করোনার মতো ভয়াবহ, আত্মীয়স্বজন
কেউ আসে না। সবাইকে দূরত্বে থাকতে হয়।’ লিপি আক্তারের পাশাপাশি হামে আক্রান্ত হয়ে
বর্তমানে এই হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন গাজীপুরের রহিমা আক্তার (৪০), নরসিংদীর
মাহমুদুল হাসানসহ (৩২) প্রাপ্তবয়স্ক অন্তত ৪৪ জন মানুষ।
ডেঙ্গুতে ১ জনের মৃত্যু, হাসপাতালে ১১০ জন: হামের এই ভয়াবহতার মাঝেই দেশে ডেঙ্গুতে
আরও একজনের মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া নতুন করে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি
হয়েছেন ১১০ জন রোগী।
সোমবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বুলেটিনে বলা হয়েছে, গত এক দিনে ডেঙ্গু নিয়ে ঢাকা
উত্তর সিটির হাসপাতালে ১ জন ও দক্ষিণ সিটির হাসপাতালে ১২ জন ভর্তি হয়েছেন।
এই দুই সিটি করপোরেশনের বাইরে ঢাকা বিভাগে ১৫ জন, বরিশাল বিভাগে ৩৫ জন, চট্টগ্রাম
বিভাগে ১২ জন, খুলনা বিভাগে ২১ জন, ময়মনসিংহে ৮ জন, রাজশাহীতে ৫ জন এবং সিলেট
বিভাগে ১ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। গত ২৪ ঘণ্টায় মারা যাওয়া একমাত্র ডেঙ্গু
রোগীটি খুলনা বিভাগের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন।
গত বছর ডেঙ্গুর ব্যাপক দাপট দেখা গেলেও, চলতি বছরের এ পর্যন্ত মশাবাহিত এই রোগে
মৃত্যুর সংখ্যা কিছুটা কম। গত মার্চ ও এপ্রিল মাসে ডেঙ্গুতে কারও মৃত্যু হয়নি। তার
আগে জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে দুজন করে এবং মে মাসে একজনের মৃত্যু হয়েছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ডেঙ্গুতে সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হয়েছিল নভেম্বর মাসে;
সেই একক মাসেই প্রাণ হারিয়েছিলেন ১০৪ জন মানুষ।
বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ ও পূর্বাভাস: জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা
বিভাগের অধ্যাপক ও খ্যাতনামা কীটতত্ত্ববিদ কবিরুল বাশার দীর্ঘদিন ধরে মশা নিয়ে
গবেষণা করছেন। তার মতে, বর্তমানের টানা বৃষ্টি ও আর্দ্র আবহাওয়া এডিস মশার প্রজননের
জন্য একদম আদর্শ সময়। তিনি পূর্বাভাস দিয়ে বলেন, এবারের ডেঙ্গুর ঢেউ হয়তো ২০২৩
সালের মতো অতটা ভয়াবহ রূপ নেবে না; তবে গত বছরের চেয়ে এর প্রকোপ ও বিস্তৃতি অনেক
বেশি হওয়ার শঙ্কা রয়েছে।





