বুধবার, ৩রা জুন, ২০২৬, ২০শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩

ওষুধ রপ্তানিতে ২৫ কোটি ডলারের মাইলফলক ছোঁয়ার সম্ভাবনা

বাংলাদেশের ফার্মাসিউটিক্যালস শিল্প এখন কেবল দেশীয় চাহিদা মেটাচ্ছে না, বরং

বিশ্ববাজারে একটি শক্ত অবস্থান তৈরি করছে। বাংলাদেশের জন্য ওষুধ শিল্প এখন শুধু

অর্থনীতির চালিকাশক্তি নয়, বরং বৈশ্বিক বাজারে এক আস্থার নাম হয়ে উঠছে। দেশের

রপ্তানি খাতে ওষুধশিল্প এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছাতে শুরু করেছে। এক দশকেরও বেশি সময়

ধরে ধারাবাহিক অগ্রগতির পর এবার প্রথমবারের মতো ২৫ কোটি ডলার রপ্তানি আয়ের মাইলফলক

স্পর্শ করার জোরালো সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) সর্বশেষ

তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে (জুলাই-এপ্রিল) এই খাত থেকে ১৯

কোটি ৪৬ লাখ ৩০ হাজার ডলারের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হয়েছে, যা আগের অর্থবছরের একই

সময়ের তুলনায় ৯ দশমিক ৭০ শতাংশ বেশি। বিশেষ করে গত এপ্রিল মাসে এককভাবে ওষুধ

রপ্তানি আয় বেড়েছে ১০০ শতাংশের বেশি। বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে অর্থবছরের বাকি

দুই মাসে আয় ২৫ কোটি ডলারের ঘর স্পর্শ করবে বলে আশা করা হচ্ছে।

গত দেড় দশকে বাংলাদেশের ওষুধ রপ্তানি খাতে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন এসেছে। ২০১০-১১

অর্থবছরে যেখানে ওষুধ রপ্তানি থেকে আয় ছিল মাত্র ৪ কোটি ৪২ লাখ ডলার, সেখানে

২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা ২১ কোটি ৩১ লাখ ৬০ হাজার ডলারে উন্নীত হয়েছে। অর্থাৎ ১৫ বছরের

ব্যবধানে এই খাতের রপ্তানি আয় বেড়েছে পাঁচ গুণেরও বেশি। গত দেড় দশকে কেবল একবারই

রপ্তানি আয় সামান্য কমেছিল, নতুবা প্রতি বছরই প্রবৃদ্ধির ধারা বজায় ছিল। গত ২০২৩-২৪

অর্থবছরে প্রথমবারের মতো এই খাত ২০ কোটি ডলারের বেশি আয় করে এক নতুন মাইলফলক অর্জন

করেছিল।

বর্তমানে বাংলাদেশের ওষুধ বিশ্বের ১৫০টিরও বেশি দেশে রপ্তানি হচ্ছে। স্বল্পোন্নত

দেশগুলোর পাশাপাশি এখন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, জার্মানি

এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিভিন্ন দেশেও দেশীয় ওষুধের চাহিদা ক্রমশ বাড়ছে। গত দুই বছরে

প্রায় ১ হাজার ২০০টি ওষুধপণ্য রপ্তানির জন্য বিভিন্ন দেশে নিবন্ধন পেয়েছে।

বাংলাদেশের অন্তত ১০টি ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে বিশ্ব স্বাস্থ্য

সংস্থা এবং উন্নত দেশগুলোর কঠোর নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর অনুমোদন পেয়েছে। দেশের মোট

ওষুধ রপ্তানির প্রায় অর্ধেক আয় আসছে বেক্সিমকো ফার্মা, ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যালস

এবং স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস থেকে। রপ্তানির তালিকায় অগ্রণী ভূমিকায় রয়েছে রেনাটা,

একমি, অ্যারিস্টোফার্মা, এসকেএফ ও বিকন ফার্মার মতো প্রতিষ্ঠানগুলোও।

ওষুধ রপ্তানিতে ধারাবাহিক সাফল্য এলেও এই শিল্পের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে

চিহ্নিত হয়েছে কাঁচামালের ওপর অত্যধিক আমদানিনির্ভরতা। দেশের প্রয়োজনীয় ওষুধের

প্রায় ৯৫ শতাংশ স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত হলেও এর মূল কাঁচামাল বা অ্যাকটিভ

ফার্মাসিউটিক্যাল ইনগ্রেডিয়েন্ট (এপিআই)-এর সিংহভাগই চীন ও ভারত থেকে আমদানি করতে

হয়। এর ফলে প্রতি বছর প্রায় দেড় বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক মুদ্রা বিদেশে চলে যাচ্ছে।

মুন্সীগঞ্জের গজারিয়ায় ওষুধের কাঁচামাল উৎপাদনের জন্য ১৭ বছর আগে এপিআই শিল্পপার্ক

গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা এখনও পুরোপুরি কার্যকর হয়নি। শিল্পপার্কটির

প্লটগুলো অধিকাংশ অব্যবহৃত থাকায় স্থানীয়ভাবে কাঁচামাল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা

ব্যাহত হচ্ছে।

তবে স্থানীয়ভাবে কাঁচামাল উৎপাদনের সক্ষমতা বাড়ানো গেলে আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে এই

খাত থেকে রপ্তানি আয় ৫ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করা সম্ভব। তৈরি পোশাকশিল্পের মতো

ওষুধশিল্পেও বৈশ্বিক বাজারে বড় সাফল্য অর্জনের সক্ষমতা বাংলাদেশের রয়েছে। বর্তমানে

দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলো ৪০টিরও বেশি এপিআই উৎপাদন করছে এবং প্রয়োজনীয় আর্থিক ও নীতিগত

সহায়তা পেলে দেশের মোট চাহিদার ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ কাঁচামাল দেশেই উৎপাদন করা সম্ভব

হবে। যথাযথ টাস্কফোর্স গঠন এবং নমুনা পরীক্ষা ও অনুমোদন প্রক্রিয়া সহজ করার মাধ্যমে

এই শিল্পকে একটি শক্তিশালী ভিত্তির ওপর দাঁড় করানো এখন সময়ের দাবি।

পোস্টটি শেয়ার করুন