ইসরায়েলের গুপ্তচরবৃত্তি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে উদ্বেগ ক্রমেই বাড়ছে। সাম্প্রতিক
মার্কিন গোয়েন্দা রিপোর্টে বলা হয়েছে, ইরানের সঙ্গে শান্তি চুক্তিতে যুক্ত আমেরিকার
মধ্যস্থতাকারীদের ওপর আড়ি পাতছে ইসরায়েলি গুপ্তচর সংস্থাগুলো।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল একে অপরের ওপর নজরদারি চালায়—এ কথা দীর্ঘদিন ধরেই দুই দেশের
জানা। তা এত দিন মেনেও নেওয়া হয়েছে। কিন্তু কয়েকজন মার্কিন কর্মকর্তা জানান, ইরানের
সঙ্গে আলোচনার বিষয়ে আমেরিকার অবস্থান জানতে ইসরায়েলের এই তৎপরতা এবার মাত্রা
ছাড়িয়েছে।
ওই রিপোর্টে বলা হয়েছে, ঊর্ধ্বতন মার্কিন কর্মকর্তাদের ওপর আড়ি পাতার চেষ্টা
বাড়িয়েছে ইসরায়েল। এ তালিকায় রয়েছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রধান
মধ্যস্থতাকারী স্টিভ উইটকফ, পেন্টাগনের শীর্ষ নীতিনির্ধারক এলব্রিজ এ কোলবি এবং তার
অন্যতম প্রধান সহকারী মাইকেল পি ডিমিনো দ্য ফোর্থ।
ডিফেন্স ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি ও অন্যান্য সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার তৈরি আরও এক
রিপোর্টে বিগত কয়েক বছরের ঘটনাবলি বিশ্লেষণ করা হয়েছে। তাতে বলা হয়েছে, ইসরায়েলের
এই পাল্টা নজরদারির হুমকি সম্প্রতি ‘উচ্চ’ পর্যায় থেকে ‘সংকটজনক’ মাত্রায় পৌঁছেছে।
ডিফেন্স কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স অ্যান্ড সিকিউরিটি এজেন্সির সাহায্য নিয়ে তৈরি এই
রিপোর্টে মার্কিন সামরিক কর্মী ও সরকারি কর্মকর্তাদের ওপর ইসরায়েলের নজরদারির
বিভিন্ন চেষ্টার কথা তুলে ধরা হয়েছে।
ইসরায়েলের এই গুপ্তচরবৃত্তির রিপোর্ট এবং তা নিয়ে উদ্বেগ এমন এক সময়ে প্রকাশ্যে এল,
যখন দুই দেশের সম্পর্ক অত্যন্ত সংবেদনশীল পর্যায়ে রয়েছে। আমেরিকা ও ইসরায়েল যৌথভাবে
ইরানের বিরুদ্ধে লড়াই করছে। দুই দেশের সামরিক সমন্বয় এখন অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে
বেশি। এমনকি ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ডে মার্কিন সেনাকর্তাদের সঙ্গে কাজ করছেন ইসরায়েলি
সামরিক কর্মকর্তারাও।
ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর সঙ্গে বিপুল পরিমাণ কৌশলগত ও অভিযানের তথ্য আদানপ্রদান করছে
মার্কিন সেনাবাহিনী। তবে যুক্তরাষ্ট্রের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানান, শান্তি
আলোচনায় ট্রাম্পের কৌশল ও তার পরিবর্তনশীল অবস্থান সম্পর্কে আগাম ধারণা পেতে
নজরদারি চালাচ্ছে ইসরায়েল।
গোয়েন্দাদের এই নতুন সতর্কবার্তার ফলে ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ড ও ইসরায়েলের মধ্যে
সামরিক ও যুদ্ধ পরিকল্পনার সমন্বয় ধাক্কা খেতে পারে। বিশেষ করে পেন্টাগন যদি
ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের সঙ্গে তথ্য আদানপ্রদানের ক্ষেত্রে নতুন কোনো বিধিনিষেধ
আরোপের সিদ্ধান্ত নেয়, তবে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।
দুই দেশের সম্পর্কে ইতোমধ্যেই কিছুটা টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে। কারণ ট্রাম্প যখন
শান্তি চুক্তি করতে চাইছেন, তখন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু
চাইছেন ইরানের ক্ষমতা খর্ব করতে। একই সঙ্গে ইরান সরকারকে দুর্বল বা উৎখাত করা এবং
লেবাননে তেহরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর ওপর হামলা চালানোও নেতানিয়াহুর
অন্যতম উদ্দেশ্য।
ইসরায়েলে কর্মরত আমেরিকার প্রতিরক্ষা কর্মীদের মুঠোফোনে গোপনে আড়ি পাতার সফটওয়্যার
ইনস্টল করার বেশ কিছু ঘটনা সামনে আসার পরেই ডিফেন্স ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি এই
রিপোর্ট প্রস্তুত করেছে। এনবিসি নিউজ এই রিপোর্টের অস্তিত্ব এবং বিপদের মাত্রা
বাড়ানোর খবরটি প্রথমে প্রকাশ করে।
এ বিষয়ে আমেরিকার প্রতিরক্ষা দপ্তর কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি। অন্যদিকে নাম
প্রকাশে অনিচ্ছুক হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা এই দাবিকে মিথ্যা বলে উড়িয়ে দিয়েছেন।
ওয়াশিংটনে ইসরায়েলি দূতাবাসের এক মুখপাত্রও এই নজরদারির অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
তার দাবি, আমেরিকা বা দেশটির কোনো কর্মকর্তা ও সংস্থার ওপর ইসরায়েল কোনো রকম
গুপ্তচরবৃত্তি চালায় না।
সংবেদনশীল গোয়েন্দা তথ্য নিয়ে আলোচনার কারণে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বেশ কয়েকজন
বর্তমান ও সাবেক মার্কিন কর্মকর্তা এ পরিস্থিতির কথা জানিয়েছেন। তারা বলেন, ‘এই
সতর্কবার্তা অবশ্য পুরোপুরি অপ্রত্যাশিত নয়। যুক্তরাষ্ট্রের মতোই ইসরায়েলও দীর্ঘ
দিন ধরে তার শত্রু ও মিত্র—উভয় পক্ষের বিরুদ্ধেই আগ্রাসীভাবে তথ্য জোগাড়ের কাজ
চালিয়ে আসছে।’
তা সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্রের অন্যান্য সব বন্ধু দেশের তুলনায় বর্তমানে ইসরায়েলের দিক
থেকে নজরদারির আশঙ্কা সবচেয়ে বেশি। কয়েকটি শত্রু দেশের চেয়েও তা অনেক ওপরে।
কর্মকর্তারা বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলোর মধ্যে একমাত্র দক্ষিণ কোরিয়ার
ক্ষেত্রে কিছু কিছু পরিস্থিতিতে এই আশঙ্কার মাত্রা ‘উচ্চ’ থাকে, যা ইসরায়েলের এই
গুপ্তচরবৃত্তির কাছাকাছি পৌঁছায়।
একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, ‘ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে আমেরিকার কর্মকর্তাদের
ওপর ইসরায়েলের তথ্য সংগ্রহের এই আগ্রাসী মনোভাব ‘সব সীমা ছাড়িয়ে গেছে’। দুজন
ঊর্ধ্বতন মার্কিন সেনা কর্মকর্তা জানান, ইসরায়েলে বা ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের সঙ্গে
কর্মরত মার্কিন কর্মীরা এই নতুন রিপোর্টের আগেই নজরদারির ঝুঁকি সম্পর্কে ওয়াকিবহাল
ছিলেন।
অভ্যন্তরীণ মূল্যায়ন নিয়ে কথা বলার কারণে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই কর্মকর্তারা
জানান, বিশেষত ইসরায়েল সফরের সময় নিজেদের মুঠোফোন এবং অন্যান্য বৈদ্যুতিক যন্ত্র
সুরক্ষিত রাখতে মার্কিন কর্মীরা বিভিন্ন নিরাপত্তা বিধি ও প্রোটোকল মেনে চলেন। তবে
নিরাপত্তার স্বার্থে সেই পদক্ষেপগুলোর বিস্তারিত বিবরণ দিতে তারা রাজি হননি।
কর্মকর্তা ও বিশেষজ্ঞদের মতে, শীর্ষ মার্কিন কর্মকর্তারা ইসরায়েল সফরে গেলে প্রায়ই
বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করেন। অনেক সময়ে তারা ‘বার্নার ফোন’ (অস্থায়ী ফোন) ও আলাদা
কম্পিউটার ব্যবহার করেন। সরকারি সফরের সময় হোটেল রুমে কথা বলার ক্ষেত্রেও চূড়ান্ত
সাবধানতা অবলম্বন করা হয়।
দুই দেশের সেনাবাহিনীর মধ্যে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা থাকলেও নিজেদের সবচেয়ে
সংবেদনশীল তথ্য গোপন রাখার প্রয়োজন উভয় পক্ষেরই রয়েছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়
ইসরায়েলের কিরিয়াত গাত-এ মার্কিন নেতৃত্বাধীন সিভিল-মিলিটারি কোঅর্ডিনেশন সেন্টারের
কথা।





