সোমবার, ৮ই জুন, ২০২৬, ২৫শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩

দলের ভাঙন ঠেকাতে মরিয়া মমতা

তৃণমূল কংগ্রেসের (টিএমসি) অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ যখন ক্রমশ গভীর হচ্ছে, তখন দলনেত্রী

ও পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি রাজ্য ও জাতীয় রাজনীতিতে

নিজেদের অবস্থান পুনরুদ্ধারে নতুন করে কৌশল সাজাচ্ছেন। দলীয় ভাঙন ও বিদ্রোহের আবহের

মধ্যেই তিনি বিরোধী জোট ইন্ডিয়ার (INDIA) আসন্ন বৈঠকে অংশ নিতে দিল্লি যাচ্ছেন।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের খবরে বলা হয়েছে, টিএমসি সূত্রে জানা

গেছে—আজ সোমবার দিল্লিতে ইন্ডিয়া জোটের গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। ওই বৈঠকে

অংশ নিতে মমতা ব্যানার্জি আজ রোববার রাজধানী দিল্লিতে পৌঁছাবেন এবং মঙ্গলবার

পর্যন্ত সেখানে অবস্থান করবেন। দলের জাতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক ব্যানার্জি

ইতোমধ্যেই শনিবার দিল্লিতে পৌঁছেছেন। ধারণা করা হচ্ছে, মমতা, অভিষেক এবং দলের

কয়েকজন জ্যেষ্ঠ সাংসদ এই বৈঠকে একসঙ্গে অংশ নেবেন।

দলের ভেতরে চলমান অস্থিরতার মধ্যেই গত শুক্রবার মমতা ব্যানার্জি বড় ধরনের সাংগঠনিক

রদবদল করেন। এতে মূলত তার অনুগত ও পুরনো নেতাদের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে আনা হয়।

বিতর্ক থাকা সত্ত্বেও তিনি অভিষেক ব্যানার্জিকে জাতীয় সাধারণ সম্পাদক পদে বহাল

রাখেন, যদিও সাম্প্রতিক বিধানসভা নির্বাচনে টিএমসির পরাজয়ের পর তার ভূমিকা নিয়ে

ব্যাপক সমালোচনা চলছে।

একইসঙ্গে মমতা দুইজন যৌথ জাতীয় সাধারণ সম্পাদক হিসেবে রাজ্যসভা সাংসদ ডেরেক

ও’ব্রায়েন ও ডোলা সেনকে নিয়োগ দেন। দলীয় সূত্রের মতে, এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে তিনি

স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন যে ভবিষ্যতে সংগঠনের সিদ্ধান্ত এককভাবে নয়, বরং যৌথভাবে

নেওয়া হবে। এক জ্যেষ্ঠ টিএমসি সাংসদ জানান, দলের ভেতরে মূল অসন্তোষ অভিষেক

ব্যানার্জিকে কেন্দ্র করেই তৈরি হয়েছে। তার মতে, ‘মমতা ব্যানার্জি এখন পরিস্থিতি

সামাল দিতে এবং দলের ভেতরের আস্থা ফিরিয়ে আনতে মরিয়া চেষ্টা করছেন।’

এদিকে ইন্ডিয়া জোটের বৈঠকের আগে কংগ্রেসও টিএমসির পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছে। টিএমসি

সূত্রে জানা গেছে, মমতা ব্যানার্জি দিল্লি সফরের সময় সোনিয়া গান্ধীর সঙ্গে

সাক্ষাতের চেষ্টা করছেন, তবে এখনো পর্যন্ত সেই বৈঠক নিশ্চিত হয়নি। কংগ্রেসের এক

জ্যেষ্ঠ নেতা বলেন, অতীতে মমতা ব্যানার্জির কংগ্রেসবিরোধী অবস্থান এবং ইন্ডিয়া

জোটের নেতৃত্ব নিয়ে তাঁর ভূমিকার সমালোচনার প্রসঙ্গ তুলে ধরে জানান, ‘এখন সংকটের

সময় কংগ্রেস আলাদা থাকবে না, তবে অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠতাও দেখাবে না।’

টিএমসির অভ্যন্তরে বিদ্রোহী গোষ্ঠী ও মূল নেতৃত্বের মধ্যে মতপার্থক্য আরও স্পষ্ট

হয়েছে। বিধানসভায় প্রায় ৬০ জন বিদ্রোহী বিধায়কের সমর্থনে বিরোধী দলনেতা হিসেবে উঠে

আসা ঋতব্রত ব্যানার্জি প্রস্তাব দিয়েছেন যে মমতা ব্যানার্জি দলে ‘প্রধান

পরামর্শদাতা’ হিসেবে থাকতে পারেন। তবে এই প্রস্তাব ঘিরে বিদ্রোহী শিবিরেই মতবিরোধ

তৈরি হয়েছে।

বিদ্রোহী বিধায়ক গুলশান মল্লিক বলেন, ‘মমতা ব্যানার্জি যদি সর্বোচ্চ নেতা না থাকেন,

তাহলে পুরো বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করতে হবে।’ অন্যদিকে আরেক বিদ্রোহী বিধায়ক সঙ্গীতা

রায় বসুনিয়া স্পষ্টভাবে বলেন, ‘মমতা ব্যানার্জি আমাদের সর্বোচ্চ নেতা এবং থাকবেন।’

দলের অভ্যন্তরীণ সূত্র জানিয়েছে, মমতা ব্যানার্জি এখন মুসলিম বিধায়কদের সঙ্গেও

যোগাযোগ বাড়াচ্ছেন। মোট ৮০ জন বিধায়কের মধ্যে ৩১ জন মুসলিম হওয়ায় এই গোষ্ঠীর

অবস্থান রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিদ্রোহী শিবিরে ইতিমধ্যেই কিছু

মুসলিম বিধায়ক যোগ দিলেও, অন্যরা এখনো মূল নেতৃত্বের সঙ্গে রয়েছেন।

একই সঙ্গে লোকসভায় টিএমসির ২৮ জন সাংসদের মধ্যেও বিদ্রোহের সম্ভাবনা নিয়ে জল্পনা

বাড়ছে। রাজনৈতিক মহলে আলোচনা চলছে, দিল্লিতে মমতার অবস্থানকালেই কিছু সাংসদ লোকসভার

স্পিকারের কাছে অভিষেক ব্যানার্জিকে দলীয় সংসদীয় নেতা পদ থেকে সরানোর দাবি জানাতে

পারেন। দলের এক জ্যেষ্ঠ সাংসদের দাবি, বিধানসভায় যেমন বিদ্রোহে বড় ধরনের ভাঙন দেখা

গেছে, তেমনি লোকসভাতেও একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। তার ভাষায়, ‘সমর্থন ১৯

জন হলে অভিষেক ব্যানার্জিকে সরানো সম্ভব, এবং সেই সংখ্যা আরও বাড়তেও পারে।’

পোস্টটি শেয়ার করুন