মঙ্গলবার, ৯ই জুন, ২০২৬, ২৬শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩

বৈশ্বিক সংঘাতে বাড়ছে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি, অস্থির অভ্যন্তরীণ বাজার

কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে চলমান অচলাবস্থার কারণে বিশ্ব বাণিজ্য ও

অর্থনীতিতে নজিরবিহীন চাপ তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক এই নৌপথে বিঘ্ন ঘটায় বৈশ্বিক তেল

ও প্রাকৃতিক গ্যাস বাণিজ্যের প্রায় ২০ শতাংশ এবং সার বাণিজ্যের একটি বড় অংশ

মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোর তেল রফতানি বিঘ্নিত

হওয়ায় বিশ্ববাজারে বর্তমানে তেলের চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে বিশাল ব্যবধান তৈরি

হয়েছে, যার ফলে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম যুদ্ধপূর্ব সময়ের তুলনায় প্রায় ৩০ শতাংশ এবং

ইউরোপীয় গ্যাসের দাম ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা এবং

ওয়ার্ল্ড মেরিটাইম কাউন্সিলের তথ্য অনুযায়ী, জাহাজের জ্বালানি খরচ ইতিমধ্যে ৫৯

শতাংশ বেড়েছে, যা বৈশ্বিক মুদ্রাস্ফীতির পূর্বাভাসকে আরও উসকে দিচ্ছে।

আর্থিক সংকট ও সরবরাহ শৃঙ্খলে এই অস্থিরতার প্রভাবে বিশ্ব অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির

পূর্বাভাসে বড় ধরনের নেতিবাচক সংশোধন করা হয়েছে। অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন

সংস্থা (ওইসিডি) তাদের সর্বশেষ প্রতিবেদনে জানিয়েছে যে, যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে

বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি ২.১ শতাংশ পর্যন্ত নেমে আসতে পারে, যা বিশ্ব অর্থনীতির জন্য

অন্তত ৭০০ বিলিয়ন ডলারের ক্ষতির কারণ হতে পারে। একই সাথে ক্রেডিট রেটিং সংস্থা ফিচ

রেটিংস ২০২৬ সালের জন্য তাদের বিশ্ব প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমিয়ে ২.৪ শতাংশে নামিয়ে

এনেছে। তবে তেলের এই ভয়াবহ সংকটের মধ্যেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চালিত প্রযুক্তি

খাতের শক্তিশালী গতির কারণে বিশ্ব বাণিজ্যের ওপর কিছুটা ইতিবাচক প্রভাব বজায় রয়েছে।

ফিচের মতে, হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্য প্রবাহ আগামী জুলাইয়ের আগে স্বাভাবিক হওয়ার

সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ।

আন্তর্জাতিক এই অস্থিরতার প্রবল প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী ভোগ্যপণ্যের

পাইকারি বাজারে। ইউক্রেন থেকে শুরু করে মধ্যপ্রাচ্যের বোমার আওয়াজ হাজার মাইল দূরে

এই সরু গলিগুলোতেও অর্থনৈতিক ভূকম্পন তৈরি করেছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, লোহিত

সাগরে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা এবং ডলারের অস্থিতিশীল দরের কারণে খাতুনগঞ্জের

ব্যবসায়ীরা বর্তমানে খাদের কিনারায় দাঁড়িয়ে টিকে থাকার সংগ্রাম করছেন। লোকসান এড়াতে

আমদানিকারকরা এখন অতিরিক্ত মজুত করার পরিবর্তে প্রয়োজনভিত্তিক পণ্য আমদানিতে

গুরুত্ব দিচ্ছেন এবং বাকিতে পণ্য বিক্রি অনেকাংশেই কমিয়ে দিয়েছেন। আন্তর্জাতিক

শিপিং রুট পরিবর্তনের কারণে পণ্য পৌঁছানোর সময় প্রায় ২৫ দিন পর্যন্ত বেড়ে গেছে, যার

সরাসরি প্রভাব পড়ছে স্থানীয় পণ্যের বাজারদরে।

এদিকে দেশের বৈদেশিক পণ্য বাণিজ্যেও বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের

সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে (জুলাই-এপ্রিল)

বাণিজ্য ঘাটতি বেড়ে ২২.২১ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায়

প্রায় ২২ শতাংশ বেশি। আলোচ্য সময়ে দেশে মোট ৫৮.২২ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি হলেও

রফতানি আয় হয়েছে মাত্র ৩৬ বিলিয়ন ডলার। আমদানির তুলনায় রফতানি না বাড়ায় এবং

বিশ্ববাজারে জ্বালানিসহ সব ধরণের পণ্যের মূল্য চড়া থাকায় এই ঘাটতি উদ্বেগজনক

পর্যায়ে পৌঁছেছে। তবে স্বস্তির বিষয় হলো, একই সময়ে প্রবাসীরা ২ হাজার ৯৩২ কোটি ডলার

রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন, যা আগের বছরের তুলনায় ১৯.৫ শতাংশ বেশি। বিদেশি বিনিয়োগ

বৃদ্ধি পেলেও শেয়ারবাজারে পোর্টফোলিও ইনভেস্টমেন্ট বর্তমানে নেতিবাচক অবস্থানে

রয়েছে। সামগ্রিকভাবে বৈশ্বিক সংঘাত ও সরবরাহ ব্যবস্থার অনিশ্চয়তা বাংলাদেশের

অর্থনীতিতে এক বহুমুখী চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।

পোস্টটি শেয়ার করুন