চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের আগে রিজার্ভ কমতে কমতে ২০ বিলিয়ন
ডলারের ঘরে নেমে এসেছিল। আর সেটা দেশের অর্থনীতির জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দেখা
দেয়। তবে বর্তমান সরকারের আমলে টাকা পাচার বন্ধ থাকায় এবং প্রবাসী আয়ের প্রবৃদ্ধি
ইতিবাচক ধারায় থাকায় টানা ৪৫ মাস পর দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ফের ৩৭ বিলিয়ন
ডলার ছাড়িয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ২৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রিজার্ভ রেখে
যাওয়া হয়। সেখান থেকে ৩৭ বিলিয়ন ডলারে আনা দেশের অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক। এর ফলে
ফিরবে টেকসই অর্থনীতি ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ।
মধ্যপ্রাচ্যের বড় সংকটের মধ্যেও দেশে প্রবাসী আয় আসায় নতুন রেকর্ড হয়েছে। গত ১২
মাসে প্রবাসীরা প্রায় ৩৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের প্রবাসী আয় পাঠিয়েছেন। প্রবাসী আয়ের
ওপর ভর করে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভেরও উন্নতি হয়েছে। এখন ব্যবহারযোগ্য রিজার্ভ আছে
প্রায় ৩২ বিলিয়ন ডলার।
প্রবাসীদের রেমিট্যান্স বৈধ উপায়ে দেশে পাঠানোকে উৎসাহিত করতে প্রণোদনা ২.৫ শতাংশ
করেছে সরকার। জনমানুষের সার্বিক জীবনমান উন্নয়ন, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধি,
মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে
প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রবাসী বাংলাদেশিদের
কষ্টার্জিত বৈদেশিক আয় বৈধ উপায়ে দেশে আনার লক্ষ্যেই এই প্রণোদনা দেওয়া হয়।
সর্বশেষ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যানুসারে- মোট (গ্রস) রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ৩৭ দশমিক ০৫
বিলিয়ন ডলারে। আর আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) বিপিএম-৬ হিসাব পদ্ধতিতে
রিজার্ভের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩২ দশমিক ৪৮০ বিলিয়ন (৩২,৪৭৯.৮৮ মিলিয়ন) ডলার।
চলতি মাসের শুরুতে, ১ জুন মোট রিজার্ভ ছিল ৩৪ দশমিক ৭৬ বিলিয়ন ডলার এবং বিপিএম-৬
অনুযায়ী ছিল ৩০ দশমিক ১০ বিলিয়ন ডলার। সে হিসাবে এক মাসেই মোট রিজার্ভ বেড়েছে প্রায়
২ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার এবং বিপিএম-৬ অনুযায়ী বেড়েছে প্রায় ২ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার।
এর আগে ২০২২ সালের ২০ সেপ্টেম্বর সবেশেষ দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩৭ বিলিয়ন
ডলারের ঘরে ছিল। তবে আমদানি ব্যয় পরিশোধের চাপের কারণে পরদিনই রিজার্ভ ৩৭ বিলিয়ন
ডলারের নিচে নেমে যায়।
২০২২ সালের ২১ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, রিজার্ভ কমে দাঁড়িয়েছিল
৩৬ দশমিক ৯৮ বিলিয়ন ডলারে। ওই সময় কেন্দ্রীয় ব্যাংক আমদানি বিল পরিশোধে বিভিন্ন
ব্যাংকের কাছে প্রায় ৭০ মিলিয়ন ডলার বিক্রি করায় রিজার্ভে এই পতন ঘটে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের সময় মোট রিজার্ভ নেমে আসে ২৫ দশমিক ৯২
বিলিয়ন ডলারে। আইএমএফের বিপিএম-৬ হিসাব অনুযায়ী তখন রিজার্ভ ছিল ২০ দশমিক ৪৮ বিলিয়ন
ডলার।
পরে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ডলারের বিনিময় হার ধীরে ধীরে বাজারভিত্তিক
করা হয়। পাশাপাশি প্রবাসী আয় বাড়াতে নানা উদ্যোগ নেওয়া হয় এবং আমদানির ওপর আরোপিত
বিধিনিষেধও পর্যায়ক্রমে শিথিল করা হয়। এতে বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহ বাড়তে শুরু করে।
বর্তমান বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় দেশের মোট রিজার্ভ ছিল প্রায়
৩৪ বিলিয়ন ডলার। আইএমএফের বিপিএম-৬ হিসাব অনুযায়ী তা ছিল প্রায় ৩০ বিলিয়ন ডলার।
এরপর ধারাবাহিকভাবে রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধি এবং বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনায়
স্থিতিশীলতা ফেরার ফলে রিজার্ভ আবারও ৩৭ বিলিয়ন ডলারের ঘরে ফিরেছে।
দেশের ইতিহাসে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সর্বোচ্চ ৪৮ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছিল ২০২১
সালের আগস্টে। তবে অনিয়ন্ত্রিত অর্থ পাচারসহ বিভিন্ন কারণে রিজার্ভ ক্রমশ কমে গিয়ে
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের সময় তা নেমে আসে ২০ দশমিক ৪৮ বিলিয়ন ডলারে।
সূত্র জানিয়েছে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বলা চলে
তলানিতে নেমে গিয়েছিল। আমদানির আড়ালে প্রতি মাসেই বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচার হতো।
রেমিট্যান্স কমে গিয়েছিল হুন্ডি তৎপরতা বেড়ে যাওয়ায়। ফলে প্রতি মাসেই যে পরিমাণ
রপ্তানি ও রেমিট্যান্সসহ বিভিন্ন উৎস থেকে যে পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা বাংলাদেশ আহরণ
করত, আমদানিসহ বৈদেশিক মুদ্রার ব্যয় হতো তার চেয়ে এক বিলিয়ন ডলারের বেশি। ফলে প্রতি
মাসেই বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এক বিলিয়ন ডলার করে ক্ষয় হয়ে যেত।
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র জানিয়েছে, হুন্ডি প্রতিরোধ ও টাকা পাচার বন্ধে বাংলাদেশ
ব্যাংকের চলমান কার্যক্রম অব্যাহত থাকলে ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স প্রবাহ আরো
বাড়বে। এতে স্থিতিশীল থাকবে বৈদেশিক মুদ্রাবাজার।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ মোস্তফা কে মুজেরী গণমাধ্যমকে বলেন,
প্রবাসী আয় বাড়ার অন্যতম প্রধান কারণ হুন্ডিতে অর্থ আসা কমে যাওয়া। হুন্ডির মাধ্যমে
টাকা পাচার হতো। এছাড়া বৈধ ও অবৈধ পথে ডলারের দামের পার্থক্য কমে এসেছে। পাশাপাশি
বৈধ পথে আয় পাঠানো ও গ্রহণ সহজ হয়েছে। ফলে প্রবাসী আয় আসা বেড়েছে। প্রবাসী আয়ের এই
ইতিবাচক ধারা দেশের রিজার্ভে পড়েছে। এর ফলে টেকসই অর্থনীতি ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ
ফেরাতে এ রিজার্ভ কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেনও একমত পোষণ করে বলেন, রেমিট্যান্স প্রবাহের বৃদ্ধি
রিজার্ভ পুনরুদ্ধারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ডলার সংকটের সময় ব্যাংকগুলোর এলসি
(লেটার অব ক্রেডিট) খোলার যে সমস্যা দেখা দিয়েছিল, তা এখন ধীরে ধীরে স্বাভাবিক
হচ্ছে এবং দেশের অর্থনীতি সচল হচ্ছে।





