, ,

রোনালদোর বিশ্বকাপ জয়ের আজন্ম লালিত স্বপ্নের অপমৃত্যু

ফুটবল বিধাতা হয়তো স্ক্রিপ্টটা এভাবেই লিখে রেখেছিলেন। একদিকে ২০১০ সালের

বিশ্বচ্যাম্পিয়ন স্পেনের বাঁধভাঙা উল্লাস, অন্যদিকে সর্বকালের অন্যতম সেরা ফুটবলার

ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর বিষাদমাখা প্রস্থানের করুণ দৃশ্য। ২০২৬ বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর

লড়াইয়ে যোগ করা সময়ের নাটকীয় গোলে পর্তুগালকে ১-০ ব্যবধানে হারিয়ে কোয়ার্টার ফাইনাল

নিশ্চিত করেছে স্পেন। আর এই হারের সঙ্গেই ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম বর্ণাঢ্য এক

মহাকাব্যের অবসান ঘটল—বিশ্বকাপের মঞ্চ থেকে অশ্রুসিক্ত নয়নে চিরবিদায় নিলেন ৪১ বছর

বয়সী মহাতারকা ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো।

ডালাস স্টেডিয়ামে সোমবার রাতে নির্ধারিত ৯০ মিনিটের লড়াই শেষে যখন মনে হচ্ছিল

ম্যাচটি অতিরিক্ত সময়ে গড়াবে, তখনই মঞ্চে আবির্ভূত হন বদলি খেলোয়াড় মিকেল মেরিনো।

ইনজুরি সময়ের প্রথম মিনিটে (৯১ মিনিট) পর্তুগিজ রক্ষণের ক্ষণিক অসতর্কতার সুযোগ নেন

ফেরান তোরেস। তার বাড়ানো নিখুঁত থ্রু পাস ধরে দুই ডিফেন্ডারের মাঝখান দিয়ে

বিদ্যুৎগতিতে বক্সে ঢুকে পড়েন মেরিনো। নিচু এবং নিখুঁত এক শটে পর্তুগিজ গোলরক্ষককে

পরাস্ত করে বল জালে জড়ান তিনি। পুরো স্টেডিয়ামে তখন স্প্যানিশ সমর্থকদের গগনবিদারী

চিৎকার, আর পর্তুগিজ শিবিরে নেমে আসে শ্মশানের নীরবতা।

ম্যাচের শুরু থেকেই দুই চিরপ্রতিবন্ধী দল ছিল আক্রমণাত্মক। অষ্টম মিনিটেই এগিয়ে

যেতে পারত স্পেন, তবে মিকেল ওইয়ারজাবালের শট লক্ষ্যভ্রষ্ট হলে বেঁচে যায় পর্তুগাল।

এর কিছুক্ষণ পরেই রোনালদোর একটি বুলেট গতির শট কর্নারের বিনিময়ে ঠেকিয়ে দেন

স্প্যানিশ দেয়াল হয়ে দাঁড়ানো উনাই সিমন। ৩৮ মিনিটে জোয়াও ফেলিক্সের হেড এবং ফিরতি

বলে রোনালদোর প্রচেষ্টাও নস্যাৎ করে দেন সিমন। প্রথমার্ধের শেষ দিকে নুনো মেন্ডিসের

শট পেদ্রো পোরোর মাথায় লেগে পোস্টে আঘাত হানলে কপাল পোড়ে পর্তুগিজদের।

দ্বিতীয়ার্ধে দুই কোচই কৌশলে পরিবর্তন আনেন। পর্তুগাল কোচ রবার্তো মার্তিনেজ ৭১

মিনিটে রাফায়েল লেয়াও এবং ডিয়োগো দালোটকে নামিয়ে আক্রমণ শানান। অন্যদিকে লুইস দে লা

ফুয়েন্তের শিষ্যরা মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে পর্তুগালকে চাপে রাখে। লামিনে ইয়ামালের

দুর্দান্ত এক ফ্রি-কিক অসাধারণ দক্ষতায় সেভ করেন পর্তুগিজ কিপার ডিয়োগো কস্তা। তবে

শেষ রক্ষা আর হয়নি। মেরিনোর সেই এক গোলই শেষ পর্যন্ত ব্যবধান গড়ে দেয়।

২০০৬ সালে যে বিশ্বকাপের যাত্রা শুরু হয়েছিল, ২০২৬-এ এসে ডালাসের ঘাসে তার সমাপ্তি

ঘটল। ম্যাচে ৪১ বছর বয়সী রোনালদোকে বেশ লড়াই করতে দেখা গেছে, তবে স্প্যানিশ

ডিফেন্ডারদের কড়া পাহারায় তিনি ছিলেন অনেকটাই নিষ্প্রভ। পুরো ম্যাচে বল স্পর্শ

করেছেন মাত্র ১২ বার। মেরিনোর গোলের পর পর্তুগাল মরিয়া হয়ে আক্রমণে উঠলেও

বার্নার্দো সিলভার হেড লক্ষ্যভ্রষ্ট হলে সব আশা শেষ হয়ে যায়।

ম্যাচের শেষ বাঁশি বাজার পর দেখা যায় এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য। সতীর্থ ও প্রতিপক্ষ

খেলোয়াড়দের সান্ত্বনা ছাপিয়ে ডুকরে কেঁদে ওঠেন রোনালদো। ফুটবল ইতিহাসের একমাত্র

খেলোয়াড় হিসেবে পাঁচটি ভিন্ন বিশ্বকাপে গোল করার কীর্তি থাকলেও, সোনালি ট্রফিটা

ছোঁয়া হলো না তার। ডালাসের গ্যালারি তখন দাঁড়িয়ে সম্মান জানাচ্ছিল এই কিংবদন্তিকে,

যিনি অশ্রুসিক্ত চোখে একাই মাঠ ছাড়েন।

পর্তুগালকে বিদায় করে কোয়ার্টার ফাইনালে পা রাখা স্পেনের রক্ষণভাগ এই বিশ্বকাপে

এখনো কোনো গোল হজম করেনি। শেষ আটে লুইস দে লা ফুয়েন্তের দলের প্রতিপক্ষ

বেলজিয়াম।রোনালদোর বিদায়ে একটি যুগের অবসান ঘটল ঠিকই, তবে ডালাসের এই রাতটি ফুটবল

ভক্তদের মনে থেকে যাবে ইতিহাসের অন্যতম সেরা এক লড়াই এবং এক কিংবদন্তির বিদায়ের

করুণ সাক্ষী হিসেবে।

পোস্টটি শেয়ার করুন