ডালাসে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া বিশ্বকাপের প্রথম সেমিফাইনালে মুখোমুখি হতে যাচ্ছে
ইউরোপের দুই শক্তিশালী ফুটবল পরাশক্তি ফ্রান্স ও স্পেন। হাইভোল্টেজ এই ম্যাচকে ঘিরে
বিশ্বজুড়ে ফুটবলপ্রেমীদের মাঝে প্রবল উত্তেজনা ও উন্মাদনা বিরাজ করছে। দুই দলের এই
মহানাটকীয় লড়াই কেবল দলগত আধিপত্য বিস্তারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না, বরং এটি
পরিণত হতে যাচ্ছে এক অনন্য ফুটবলীয় সৌন্দর্যের প্রদর্শনীতে।
এই সেমিফাইনালের মূল আকর্ষণ হয়ে দাঁড়িয়েছে দুই দলের দুই মহাতারকার চমকপ্রদ এক
ব্যক্তিগত দ্বৈরথ। একদিকে রয়েছেন ফরাসিদের আক্রমণের মূল অস্ত্র এবং ‘গতির রাজা’
হিসেবে খ্যাত ফরোয়ার্ড কিলিয়ান এমবাপ্পে। অন্যদিকে স্প্যানিশদের ভরসার প্রতীক হয়ে
উঠেছেন তরুণ ‘ড্রিবলিংয়ের জাদুকর’ লামিন ইয়ামাল। গতির সঙ্গে শৈল্পিক ফুটবলের এই
অসাধারণ লড়াই দেখতে পুরো ফুটবল বিশ্ব এখন অধীর আগ্রহে প্রহর গুনছে।
ম্যাচটিতে ফরাসি অধিনায়ক কিলিয়ান এমবাপ্পের সামনে রয়েছে এক অনন্য ইতিহাস গড়ার দারুণ
সুযোগ। স্পেনের বিপক্ষে সেমিফাইনালে জয়লাভ করতে পারলেই ব্রাজিলের কিংবদন্তি ফুটবলার
কাফুর পাশে নাম লেখাবেন তিনি। কাফুর পর ফুটবল ইতিহাসের মাত্র দ্বিতীয় খেলোয়াড়
হিসেবে টানা তিনটি বিশ্বকাপের ফাইনালে সরাসরি মাঠে নামার অবিস্মরণীয় এক রেকর্ড
স্পর্শ করবেন এই ফরাসি সুপারস্টার, যা তাকে নিয়ে যাবে অন্য এক উচ্চতায়।
তবে এমবাপ্পের ইতিহাস গড়ার এই অভাবনীয় যাত্রায় সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেন
স্প্যানিশ বিস্ময় বালক লামিন ইয়ামাল। বয়সে তরুণ হলেও মাঠের খেলায় তার জাদুকরী
ড্রিবলিং ও অসামান্য সৃজনশীলতা ইতোমধ্যে পুরো ফুটবল বিশ্বকে মুগ্ধ করেছে। তার পায়ের
জাদুকরী স্কিল যেকোনো শক্তিশালী রক্ষণভাগকেই মুহূর্তের মধ্যে বোকা বানাতে পুরোপুরি
সক্ষম, যা স্পেনের ফাইনালে ওঠার স্বপ্নকে যেমন জোরালো করেছে, তেমনি ফরাসিদের জন্য
তৈরি করেছে বড় এক দুশ্চিন্তা।
সেমিফাইনালের আগে আলোচনায় বেঞ্চে থাকা কান্তে
টানা ৩য় বার বিশ্বকাপের ফাইনালে ওঠার দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে ফ্রান্স। স্পেনের
বিপক্ষে সেমিফাইনালের মতো মহাগুরুত্বপূর্ণ ম্যাচের আগে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হওয়ার
কথা ছিল কৌশল, একাদশ কিংবা প্রতিপক্ষের শক্তি-দুর্বলতা। কিন্তু এখন সবচেয়ে বেশি
আলোচিত নাম এনগোলো কান্তে, যিনি এখনও এই বিশ্বকাপে মাঠে নামেননি।
ফরাসি গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, ক্লোজড-ডোর অনুশীলনে মাঝমাঠে দারুণ পারফর্ম করেছেন
কান্তে। আর এতেই নতুন করে শুরু হয়েছে বিতর্ক। সমর্থকদের বড় একটি অংশের দাবি,
স্পেনের মতো শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিপক্ষে অভিজ্ঞ এই মিডফিল্ডারকে অন্তত সুযোগ
দেওয়া উচিত।
নিজের প্রজন্মের অন্যতম সেরা মিডফিল্ডার হয়েও এবারের বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত
ফ্রান্সের ছয় ম্যাচের একটিতেও খেলার সুযোগ পাননি কান্তে। দিদিয়ে দেশম বরাবরের মতোই
মাঝমাঠে ভরসা রেখেছেন কুয়াদিও কোনে ও আদ্রিয়েন রাবিওর ওপর। সেই জুটিকে নিয়েই
ফরাসিরা অনায়াসে সেমিফাইনালে পৌঁছে গেছে।
তবে অনেকের মতে, বড় ম্যাচের জন্য কান্তের মতো ফুটবলারের মূল্য আলাদা। বয়সের ভারে
আগের মতো পুরো মাঠজুড়ে ছুটে বেড়াতে না পারলেও ম্যাচের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে তার
সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা, শৃঙ্খলা এবং খেলার গতি নিয়ন্ত্রণের দক্ষতা এখনো
বিশ্বমানের।
বিশেষ করে স্পেনের বিপক্ষে এই গুণগুলো আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। বলের দখল
ধরে রেখে দ্রুত পাসিং ও মাঝমাঠ নিয়ন্ত্রণে স্প্যানিশদের জুড়ি নেই। এমন প্রতিপক্ষের
বিরুদ্ধে কান্তের ট্যাকল, বল পুনরুদ্ধার এবং ট্রানজিশন ফুটবল ফ্রান্সের জন্য বাড়তি
অস্ত্র হতে পারে।
ফুটবল বিশ্লেষকদের অনেকেই মনে করেন, নকআউট পর্বের ম্যাচে কখনও কখনও একটি ট্যাকল,
একটি ইন্টারসেপশন কিংবা একটি সঠিক সিদ্ধান্তই পুরো ম্যাচের গতিপথ বদলে দেয়। আর ঠিক
সেই ধরনের মুহূর্ত তৈরির জন্য বেশ পরিচিত কান্তে।
বর্তমানে তুরস্কের ক্লাব ফেনারবাচেতে খেললেও তার অর্জনের তালিকা এখনো ঈর্ষণীয়।
বিশ্বকাপ, চ্যাম্পিয়নস লিগ, প্রিমিয়ার লিগ—ফুটবলের প্রায় সব বড় ট্রফিই রয়েছে তার
শোকেসে। ফলে অভিজ্ঞতার বিচারে বর্তমান ফরাসি দলে সেমির মতো গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে
জায়গা পেতেই পারেন কান্তে।
ফ্রান্সের উচিত স্পেনকে ভয় পাওয়া- লামিন ইয়ামাল
১৬ বছর পর নিজেদের ইতিহাসে দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে উঠেছে স্পেন। তারা
মুখোমুখি হচ্ছে গত দুই আসরে টানা দুটি ফাইনাল খেলা ফ্রান্সের। এই দলকে গত দুই বছরে
ইউরো ও নেশনস লিগ সেমিফাইনালে হারিয়েছিল লা রোজারা। শেষ চার নিশ্চিত করে তাদের
তারকা খেলোয়াড় লামিন ইয়ামাল বলেছিলেন, ফ্রান্সের উচিত স্পেনকে ভয় পাওয়া।
ইয়ামালের এই হুঙ্কারের প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে ফ্রান্স। তাদের ডিফেন্ডার ইব্রাহিমা
কোনাতে জানিয়েছেন, মঙ্গলবারের বিশ্বকাপ সেমিফাইনালে স্পেনের মুখোমুখি হওয়া নিয়ে
ফ্রান্স বিন্দুমাত্র ভীত নয়। তবে প্রতিপক্ষের শক্তিমত্তা ও তাদের প্রায় নিখুঁত
রক্ষণভাগ সম্পর্কে তারা বেশ সচেতন।
ফ্রান্স-স্পেন সেমিফাইনালের রেফারি কে এই ইভান বার্টন?
টানা তৃতীয়বারের মতো ফাইনালে ওঠার লক্ষ্যে মাঠে নামবে কিলিয়ান এমবাপ্পের ফ্রান্স।
অন্যদিকে ২০১০ সালের পর প্রথম ফাইনালে চোখ স্পেনের। ফুটবল বিশ্বের কোটি ভক্তের নজর
কাড়া এই হাইভোল্টেজ ম্যাচটি পরিচালনার দায়িত্ব কার ওপর পড়েছে, তা আনুষ্ঠানিকভাবে
প্রকাশ করেছে ফিফা।
ফ্রান্স ও স্পেনের মধ্যকার এই ম্যাচটিতে প্রধান রেফারির দায়িত্ব পালন করবেন এল
সালভাদরের ৪৪ বছর বয়সি অভিজ্ঞ রেফারি ইভান বার্টন। কনকাকাফ অঞ্চলের নেশনস লিগ এবং
গোল্ড কাপের মতো বড় টুর্নামেন্টগুলোতে নিয়মিত ম্যাচ পরিচালনার বিশাল অভিজ্ঞতা রয়েছে
তার।
২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপে প্রথম রেফারি হিসেবে অভিষেক হওয়া বার্টনের এটি
ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় বিশ্বকাপ। চলতি আসরে ইতোমধ্যে ৩টি ম্যাচ অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে
পরিচালনা করেছেন তিনি। মঙ্গলবারের সেমিফাইনালটি হতে যাচ্ছে এই বিশ্বকাপে তার চতুর্থ
অ্যাসাইনমেন্ট।





