টানা কয়েক দিনের বিক্ষোভ ও রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে ইউক্রেনের সেনাপ্রধান
ওলেক্সান্দর সিরস্কিকে বরখাস্ত করেছেন প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। তার
জায়গায় নিয়োগ দেওয়া হয়েছে যুদ্ধে অভিজ্ঞ জেনারেল মিখাইলো দ্রাপাতিইকে।
এর কয়েক দিন আগে জনপ্রিয় প্রতিরক্ষামন্ত্রী মিখাইলো ফেদোরভকে পদ থেকে সরিয়ে
দেওয়ার পর দেশজুড়ে টানা বিক্ষোভ শুরু হয়। শুরুতে ধারণা করা হচ্ছিল, ফেদোরভের
বিদায়ের পেছনে তার সঙ্গে সিরস্কির দ্বন্দ্বই কারণ। পরে স্পষ্ট হয়, ফেদোরভ ও
সিরস্কির মধ্যে মতবিরোধই এ রদবদলের অন্যতম কারণ ছিল।
গত মঙ্গলবার রাতে সামাজিকমাধ্যমে দেওয়া এক ভিডিও বার্তায় জেলেনস্কি সিরস্কিকে
দায়িত্ব থেকে অব্যাহতির ঘোষণা দেন। একই সঙ্গে ২০২২ সালে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার
আগ্রাসনের শুরুতে কিয়েভ রক্ষায় তার ভূমিকার প্রশংসা করেন।
ফেদোরভকে গত সপ্তাহে প্রতিরক্ষামন্ত্রীর পদ থেকে সরিয়ে ইয়েভহেনি খমারাকে
ভারপ্রাপ্ত প্রতিরক্ষামন্ত্রী করা হয়। জেলেনস্কি জানান, তিনি মিখাইলো ফেদোরভকে
সরকারের একটি ‘সম্মানজনক পদ’ নেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছেন। তবে তিনি সেই প্রস্তাব
গ্রহণ করেছেন কি না, তা জানা যায়নি।
৩৫ বছর বয়সি ফেদোরভকে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ে সংস্কার, সশস্ত্র বাহিনীর
আধুনিকায়ন এবং দুর্নীতিবিরোধী উদ্যোগের জন্য ব্যাপক প্রশংসা করা হয়। অন্যদিকে, ৬০
বছর বয়সি সিরস্কিকে অনেক ইউক্রেনীয় সোভিয়েত ধাঁচের একজন সেনা কমান্ডার হিসেবে
দেখেন, যিনি সেনাবাহিনীতে বড় ধরনের সংস্কারে অনাগ্রহী ছিলেন।
নতুন সেনাপ্রধান ৪৩ বছর বয়সি মিখাইলো দ্রাপাতিই ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে বলেন,
‘আমি দায়িত্বশীলভাবে, পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে এবং আজ যারা আমাদের দেশ রক্ষা করছেন
তাদের প্রতি সম্মান রেখে কাজ করব।’
একই সঙ্গে সিরস্কিকে ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, ‘ইউক্রেনীয় সেনাবাহিনীকে
শক্তিশালী করতে তার ধারাবাহিক কাজের জন্য আমি কৃতজ্ঞ। আমি এই বাহিনীতেই বড়
হয়েছি।’
এদিকে ফেদোরভ দ্রাপাতিইকে অভিনন্দন জানিয়ে বলেন, তার নিয়োগ ‘স্বাধীনতা ও
ন্যায়বিচারের জন্য স্বাধীন মানুষের লড়াইয়ে নতুন আশা’। তিনি বলেন, ‘এটি এমন
পরিবর্তনের কণ্ঠস্বর, যাকে উপেক্ষা করা সম্ভব ছিল না।’
ফেদোরভ আরও জানান, তিনি সিরস্কিকে ফোন করে কিয়েভ অঞ্চল এবং অন্যান্য ‘ঐতিহাসিক
যুদ্ধ’ রক্ষায় তার ভূমিকার জন্য ধন্যবাদ জানিয়েছেন। তবে তিনি যোগ করেন, এখন
আমাদের আরও দ্রুত এগোতে হবে এবং অতীতের ভুলগুলো শুধরে ইতিহাসের নতুন অধ্যায় লিখতে
হবে।
চলতি বছরের জানুয়ারিতেই ফেদোরভ প্রতিরক্ষামন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ পান।
যুদ্ধক্ষেত্রে তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে সেনাবাহিনীর কার্যকারিতা বাড়ানোর উদ্যোগের
জন্য তিনি ব্যাপক প্রশংসা পান।
গত সপ্তাহে ফেদোরভের স্থলাভিষিক্ত হন ইউক্রেনের নিরাপত্তা সংস্থা (এসবিইউ)-এর সাবেক
শীর্ষ কর্মকর্তা ইয়েভহেনি খমারা। জেলেনস্কি বলেন, ‘সব সিদ্ধান্ত আগামীকাল
আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর করা হবে।’
ফেদোরভকে অপসারণের পর ছয় দিন ধরে ইউক্রেনের বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভ হয়।
বিক্ষোভকারীরা সিরস্কিকে সরানোর দাবি জানিয়ে আসছিলেন। শেষ পর্যন্ত জেলেনস্কি তার
স্থলাভিষিক্ত হিসেবে দ্রাপাতিইকে নিয়োগ দেন। বিশ্লেষকদের মতে, ফেদোরভের প্রকাশ্য
সমর্থন এই সিদ্ধান্তকে রাজনৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য করে তুলতে সহায়তা করতে পারে।
এদিকে ভারপ্রাপ্ত প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়েভহেনি খমারা এবং নতুন সেনাপ্রধান
দ্রাপাতিইকে নতুন প্রতিরক্ষা কৌশল প্রণয়নের নির্দেশ দিয়েছেন জেলেনস্কি। এতে
সেনাবাহিনীর কর্পস কাঠামোর সংস্কার, অস্ত্র সরবরাহব্যবস্থা এবং ড্রোন সক্ষমতা
বাড়ানোর মতো বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
সিরস্কি এখনও এ সিদ্ধান্ত নিয়ে সরাসরি কোনো মন্তব্য করেননি। তবে গত সোমবার
প্রকাশিত এক নিবন্ধে তিনি লিখেছেন, ফেদোরভের সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিল ‘পেশাগত’। তিনি
আরও বলেন, ‘যদি আমি কাউকে, বিশেষ করে মিখাইলো আলবার্তোভিচ (ফেদোরভ)-কে কষ্ট দিয়ে
থাকি, তাহলে আমি দুঃখিত।’
বিক্ষোভ প্রসঙ্গে সিরস্কির ভাষ্য, সামরিক চুক্তি, অস্ত্র সংগ্রহ এবং সেনা সমাবেশের
মতো বিষয়গুলো জনসমক্ষে যতটা সহজভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে, বাস্তবে সেগুলো অনেক বেশি
জটিল। তার কথায়, যে সিদ্ধান্তের ওপর মানুষের জীবন নির্ভর করে, তা স্লোগান দিয়ে
নেওয়া হয় না। যুদ্ধ জেতে বাস্তব কাজ, জনসমক্ষে তৈরি হওয়া নাটক নয়।’





