আজ সকালে রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে বাংলাদেশ কৃষি সাংবাদিক ফোরাম (বিএজেএফ) দ্বারা আয়োজিত চার দিনব্যাপী ‘কৃষি ও খাদ্যে রাজনৈতিক অঙ্গীকার’ শীর্ষক আন্তর্জাতিক সম্মেলন ও কর্মশালার দ্বিতীয় দিনে বক্তারা বলেন, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাত এখনো সরকারি ভর্তুকির আওতার বাইরে। গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে তারা দাবি করেন, এই খাতগুলোতেও ভর্তুকি চালু করতে হবে, কারণ তা দেশের পুষ্টি নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক বিকাশের জন্য অপরিহার্য।
সিদ্ধান্তের সময় গড় হিসাবের ওপর নির্ভরতা একটি বিপজ্জনক প্রবণতা বলে উল্লেখ করে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা ফরিদা আখতার বলেন, ধনী পরিবারের আয় দিয়ে গরীবের খাদ্যাভ্যাসের প্রকৃত চিত্র বোঝা যায় না। ফলে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর পুষ্টির ঘাটতি ও চাহিদাগুলো অজানাই থেকে যায়, যার কারণে নীতিনির্ধারণে ভুল ধারণা সৃষ্টি হয়। এ খাতটি শুধু উৎপাদনের জন্য নয়, গ্রামীণ খাদ্যচাহিদা, সংরক্ষণ, নারীর কর্মসংস্থান ও ঐতিহ্য রক্ষা করতেও গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি আরও বললেন, বর্তমানে এই খাতকে শিল্প হিসেবে দেখা হলেও কার্যত এর ৭০-৮০ শতাংশ উৎপাদনই হচ্ছে গ্রামীণ সাধারণ মানুষের মাধ্যমে। শিল্পায়নের পাশাপাশি দেশীয় জাতের সংরক্ষণে সতর্ক থাকার তাগিদ দেন তিনি, বিশেষ করে সংকর জাত তৈরির সময় যেন ঐতিহ্যবাহী দেশীয় বৈশিষ্ট্য হারিয়ে না যায়।
পুষ্টিহীনতা সম্পর্কিত আলোচনায় তিনি উল্লেখ করেন, ‘জিরো হাঙ্গার’ মানে কেবল পেট ভরানো নয়, বরং সুষম পুষ্টি নিশ্চিত করা জরুরি। তিনি বলেন, যদিও আমরা প্রতি বছর গড়ে ১৩৭টি ডিম খাওয়ার রিপোর্ট দেখছি, তবুও এই পরিসংখ্যান ধনী ও গরিবের খাদ্যাভ্যাসের বৈষম্য ঢাকতে পারে না, ফলে দরিদ্রের প্রকৃত খাদ্যচিত্র অজানাই থেকে যায়।
গ্রামীণ খাদ্যবৈচিত্র্য রক্ষায় গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি জানান, অনেক সময় উৎপাদনকারী জেলার মানুষও নিজেদের এলাকার খাবার খেতে পারেন না। উদাহরণস্বরূপ, সুনামগঞ্জে মন মুগ্ধকর স্বাদের দেশীয় মাছের বাইরে এখন বজ্রপাতের জন্য মানুষ একুয়াকালচারের পাঙ্গাস খেতে বাধ্য হচ্ছেন। এর পাশাপাশি তিনি একুয়াকালচারের ঝুঁকি নিয়ে সতর্ক করেন, যেখানে অনিয়ন্ত্রিত ফিড ও অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্সের আশঙ্কা বাড়ছে।
উপদেষ্টা আরও বলেন, দেশের প্রাচীন ও স্বাদযুক্ত দেশীয় মাছ, মাংস ও প্রাণিসম্পদ সম্পদ রক্ষা এখন সময়ের দাবি। পৃথিবীর অনেক দেশের মতো অনেক প্রজাতি আমাদের দেশে বিলুপ্তির মুখে, যেখানে এখনও আমরা তাদের সংরক্ষণ করতে পেরেছি।
স্বাগত বক্তব্যে ব্যাখ্যা করেন, বিএজেএফ থেকে আমাদের উদ্দেশ্য মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতে রাজনৈতিক ও নীতिगत অঙ্গীকার ব্যক্ত করা। এর মধ্যে রয়েছে নদীর মাছের পুনরুদ্ধার, অপ্রয়োজনীয় বালাইনাশক ব্যবহার কমানো, চাষের মাছের মানরক্ষা এবং খামারীদের স্বার্থসুরক্ষা নিশ্চিত করতে কার্যকর পদক্ষেপ।
বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মৎস্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মো. আবদুর রউফ, যিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন ও মানবসৃষ্ট কারণের জন্য নদীর মাছের পরিমাণ কমে যাচ্ছে। তিনি চাষের ক্ষেত্রে কীটনাশকের ব্যবহার জীবনদশার মধ্যে আনতে গুরুত্বারোপ করেন।
সর্বশেষ, বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মোঃ সাজেদুল করিম উল্লেখ করেন, আধুনিক গবেষণা ও প্রযুক্তির মাধ্যমে দুধ, ডিম ও মাংসের উৎপাদন বৃদ্ধি পাওয়ায় দেশের পুষ্টির চাহিদা পূরণের সক্ষমতা এখন অনেক গুণ বেড়েছে।
অন্যান্য বক্তারা ছিলেন বাংলাদেশ লাইভস্টক রিসার্চ ইনস্টিটিউটের সাবেক মহাপরিচালক ও লাল তীর লাইভস্টকের নির্বাহী পরিচালক ড. কাজী ইমদাদুল হক, এসিআই এগ্রিবিজনেসেসের গ্রুপ উপদেষ্টা ড. ফা হ আনসারী ও আস্থা ফিড ইন্ডাস্ট্রিজের চেয়ারম্যান মোশাররফ হোসেন চৌধুরী। সম্মেলনে ব্লু অর্থনীতি বিষয়ক মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন মহাপরিচালক মো. জিয়া হায়দার চৌধুরী।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন বিশেষজ্ঞ, বিজ্ঞানী, অর্থনীতিবিদ, শিল্প উদ্যোক্তা, গবেষক ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা অংশ নেন এ আন্তর্জাতিক সম্মেলনে, যা মৎস্য, প্রাণিসম্পদ, কৃষি এবং খাদ্য নিরাপত্তা ক্ষেত্রে নতুন ধারনা ও উন্নয়নের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করছে।





