দেশের সাধারণ মানুষের জন্য স্বাস্থ্যসেবা সহজলভ্য করতে এবং ওষুধের ক্রমবর্ধমান খরচ কমাতে গুরুত্বপূর্ণ এক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। বৃহস্পতিবার (৮ জানুয়ারি) প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত উপদেষ্টা পরিষদের সভায় অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকায় আরও ১৩৬টি ওষুধ যুক্ত করার প্রস্তাব অনুমোদন দেওয়া হয়। এর ফলে, এখন থেকে এই তালিকায় থাকা ওষুধগুলোর বিক্রয় মূল্য সরকার কর্তৃক নির্ধারিত হবে এবং কোনও প্রতিষ্ঠান নির্ধারণের বাইরে দাম বিক্রি করতে পারবে না। প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী অধ্যাপক ডা. সায়েদুর রহমান বিকেলে ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে অনুষ্ঠিত এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে এই গুরুত্বপূর্ণ তথ্য নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, এই তালিকা প্রথম তৈরি হয়েছিল ১৯৮৫ সালে, পরে ১৯৯২ সালে কিছু পরিবর্তন আসে, কিন্তু দীর্ঘ সময় পর এবারই প্রথম বড় ধরনের বৈজ্ঞানিক ফর্মুলার মাধ্যমে এই সংস্কার সম্পন্ন হলো।
সরকারের এই সিদ্ধান্তের ফলে, দেশের প্রায় ৮০ শতাংশ সাধারণ মানুষ বিভিন্ন রোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত ওষুধগুলো সহজে পাবেন। ওষুধের মূল্য নিয়ন্ত্রণ হলে ব্যক্তিগত খরচ উল্লেখযোগ্য হারে কমে আসবে। অধ্যাপক ডা. সায়েদুর রহমান বলেন, সরকার পরিস্থিতি বিবেচনা করে কোনও লাভের হার বা কাঁচামালের খরচে পরিবর্তন করেনি, বরং একটি নির্দিষ্ট ফর্মুলা ব্যবহার করে দাম যৌক্তিক পর্যায়ে রেখেছেন। যেসব ওষুধের দামে বর্তমানে বৃদ্ধি রয়েছে, তাদের ধাপে ধাপে দাম কমানোর জন্য বাধ্যতামূলক নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এটি দেশের স্বাস্থ্যখাতের জন্য এক বড় মাইলফলক হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
ওষুধ শিল্পে এই পরিবর্তনের প্রভাব সম্বন্ধে সরকার সতর্কতার সাথে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে চার বছর সময় দেয়া হয়েছে যাতে তারা ধাপে ধাপে দাম সমন্বয় করতে পারেন। এছাড়া, বিশাল সংখ্যক (প্রায় ১,১০০) ওষুধের ক্ষেত্রে সরকার স্বচ্ছ তদারকি ব্যবস্থা চালু করার পরিকল্পনা নিয়েছে। এই ক্ষেত্রে ‘ইন্টারনাল রেফারেন্স প্রাইসিং’ এবং ‘এক্সটারনাল রেফারেন্স প্রাইসিং’ পদ্ধতি অনুসরণ করা হবে। যদি কোনও ওষুধ সাতটির বেশি কোম্পানি উৎপাদন করে, তবে মূল্য একই রেঞ্জের মধ্যে রাখতে হবে এবং পরবর্তী চার বছরে ধাপে ধাপে মূল্য সমন্বয় করতে হবে। কম সংখ্যক প্রোডিউসার থাকলে, বাজার মূল্য ও আন্তর্জাতিক মূল্যের মধ্যে তুলনা করে সর্বনিম্ন মূল্যই গ্রহণ করা হবে।
ডা. সায়েদুর রহমান আশা ব্যক্ত করেন, এই কার্যক্রম দ্রুত বাস্তবায়নের মাধ্যমে প্রথম থেকেই সাধারণ মানুষ এর সুফল পাবেন। তিনি আরও জানান, বাংলাদেশের চলমান স্বাস্থ্য পরিস্থিতি ও ‘হেলথ ট্রানজিশন’—যেখানে সংক্রামক ও অসংক্রামক ব্যাধি দুইই উদ্বেগজনক—তা এই তালিকায় বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। এই তালিকায় সংক্রামক রোগের পাশাপাশি ডায়াবেটিস, হাঁপানি ও অন্যান্য দীর্ঘমেয়াদী অসংক্রামক রোগের জন্য প্রয়োজনীয় ওষুধও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তবে, ক্যান্সার চিকিৎসার দিকে নজর দিয়ে কিছু দামী ওষুধ এখনই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। সামগ্রিকভাবে, এই উদ্যোগ সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যের সুরক্ষা বহুগুণে বৃদ্ধি পাবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।





