শনিবার, ২৪শে জানুয়ারি, ২০২৬, ১০ই মাঘ, ১৪৩২

অস্কারে ‘সিনার্স’-এর বিশ্বরেকর্ড: ১৬ মনোনয়নে ছাপিয়ে গেল টাইটানিককেও

চলতি বছরের অস্কারে ২৪টি বিভাগের মধ্যে রেকর্ড ১৬টি মনোনয়ন পেয়ে বিশ্ব চলচ্চিত্র

অঙ্গনকে চমকে দিয়েছে রায়ান কুগলার পরিচালিত সিনেমা ‘সিনার্স’। গত বছর মুক্তির পর

থেকেই দর্শক ও সমালোচকদের প্রশংসা কুড়ানো এই চলচ্চিত্রটি অস্কারের ৯৭ বছরের ইতিহাসে

সর্বাধিক মনোনয়নের নতুন নজির স্থাপন করেছে। অথচ ২০২৫ সালে মুক্তির আগে হলিউডের

প্রভাবশালী মহলে ধারণা ছিল, এই সিনেমাটি হয়তো শিল্পটিকে ‘ধ্বংস’ করে দিতে পারে;

কিন্তু শেষ পর্যন্ত এটিই বছরের সবচেয়ে আলোচিত ও সাংস্কৃতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ

সৃষ্টি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। ভ্যাম্পায়ার ঘরানার এই হরর সিনেমার প্রেক্ষাপট জিম

ক্রো যুগের দক্ষিণ আমেরিকা, যেখানে কৃষ্ণাঙ্গ অভিনয়শিল্পীদের প্রাধান্য এবং

আইম্যাক্স ৭০ এমএম ফরম্যাটে চিত্রায়ন ছবিটিকে এক অনন্য মাত্রা দিয়েছে। মার্ভেলের

‘ব্ল্যাক প্যান্থার’ খ্যাত পরিচালক রায়ান কুগলার এই সিনেমার মাধ্যমে এমন এক ঝুঁকি

নিয়েছিলেন, যাকে ঘিরে শুরুতে প্রবল সংশয় ছিল।

প্রায় ১০ কোটি ডলার বাজেটের এই প্রজেক্টে মাত্র দুই মাসে লেখা চিত্রনাট্য নিয়ে

কুগলার তাঁর সামর্থ্যের বাইরে চলে যাচ্ছেন বলে অনেকেই মনে করেছিলেন। এমনকি ওয়ার্নার

ব্রাদার্সকে এই ছবিতে বিনিয়োগের কারণে অনেকে ‘পাগল’ বলেছিলেন এবং কুগলারকে ছবির

ফাইনাল কাটের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ও ২৫ বছর পর মালিকানা ফিরিয়ে দেওয়ার চুক্তিকে স্টুডিও

ব্যবস্থার জন্য ‘আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত’ হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ২০২৫ সালের

১৭ এপ্রিল ইস্টার উইকএন্ডে মুক্তি পেয়ে ‘সিনার্স’ বিশ্বজুড়ে ৩৬৮ মিলিয়ন ডলার আয়

করার মাধ্যমে সকল সমালোচনাকে ভুল প্রমাণ করে। এটি গত ১৫ বছরের মধ্যে সবচেয়ে সফল

মৌলিক সিনেমা এবং যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে দশম সর্বোচ্চ আয় করা আর-রেটেড চলচ্চিত্রে

পরিণত হয়। কৃষ্ণাঙ্গ ইতিহাস ও সংস্কৃতি যখন রাজনৈতিক আক্রমণের মুখে, তখন এই ছবি

পুনরায় সেই অবমূল্যায়িত শেকড় ও বিনোদন শিল্পের রাজনীতিকে আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে

আসে।

সিনেমাটির চিত্রনাট্য দ্রুত লেখা হলেও এর পেছনে ছিল মিসিসিপি ডেল্টার লোককথা,

দাসপ্রথা-পরবর্তী সংস্কৃতি এবং ব্লুজ সংগীতের ইতিহাসের ওপর ভিত্তি করে করা দীর্ঘ

বছরের গভীর গবেষণা। কুগলার ১৯৩০-এর দশকের আলোকচিত্র ও উপেক্ষিত অভিবাসী ইতিহাসকেও

এখানে গুরুত্ব দিয়েছেন। অভিনয়ের ক্ষেত্রে হেইলি স্টেইনফেল্ড ‘মেরি’ চরিত্রে এবং

ডেলরয় লিন্ডো ‘ডেল্টা স্লিম’ চরিত্রে অনবদ্য নৈপুণ্য দেখিয়েছেন। পাশাপাশি উনমি

মোসাকুর উপস্থিতি হলিউডের প্রচলিত সুন্দরের ধারণাকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে। তবে

সবচেয়ে বেশি নজর কেড়েছেন মাইকেল বি. জর্ডান, যিনি এখানে ‘স্মোকস্ট্যাক যমজ ভাই’

নামক দ্বৈত চরিত্রে নিজের ক্যারিয়ারের সেরা পারফরম্যান্স দিয়েছেন। গিটারবাদক মাইলস

ক্যাটন তাঁর এই কাজের প্রশংসা করে বলেছেন, ‘মাইকেল যেভাবে দুই চরিত্রকে আলাদা করে

গড়ে তুলেছিলেন, তাতে দুজনের সঙ্গেই আলাদা সম্পর্ক তৈরি করা আমার জন্য সহজ হয়ে

গিয়েছিল।’

‘সিনার্স’ কোনো নির্দিষ্ট ঘরানায় সীমাবদ্ধ নয়; এটি একই সঙ্গে হরর, মিউজিক্যাল,

গ্যাংস্টার থ্রিলার এবং ঐতিহাসিক ড্রামা। কোনো পূর্বপরিচিত গল্পের ওপর ভিত্তি করে

নির্মিত না হওয়ায় দর্শকরা এতে নতুনত্বের স্বাদ পেয়েছেন। কুগলার একে তাঁর প্রয়াত

মামার প্রতি একটি ‘ভালোবাসার চিঠি’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন, যেখানে তিনি বিদ্যমান

কোনো আইপি-কে ‘আড়াল হিসেবে’ ব্যবহার করতে চাননি। প্রেক্ষাগৃহে ও স্ট্রিমিং

প্ল্যাটফর্ম—উভয় মাধ্যমেই সিনেমাটি ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। সাফল্যের পর এক খোলা

চিঠিতে কুগলার সিনেমা হলের অভিজ্ঞতার গুরুত্ব তুলে ধরে লিখেছেন, ‘আমি সিনেমায়

বিশ্বাস করি। প্রেক্ষাগৃহে সিনেমা দেখার অভিজ্ঞতায় বিশ্বাস করি। এটা সমাজের একটি

অপরিহার্য স্তম্ভ। দর্শকদের প্রতিক্রিয়া আমাকে এবং এই শিল্পে বিশ্বাস রাখা আরও

অনেককে নতুন করে প্রাণ দিয়েছে।’ অস্কারের মঞ্চে এই রেকর্ড গড়া চলচ্চিত্রটি কতগুলো

পুরস্কার নিজের করে নেয়, এখন সেটিই দেখার বিষয়।

পোস্টটি শেয়ার করুন