বৃহস্পতিবার, ২৯শে জানুয়ারি, ২০২৬, ১৫ই মাঘ, ১৪৩২

শিক্ষক সংকটে ইবিতে শিক্ষার গুণগত মানের বিঘ্ন

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় (ইবি) প্রতিষ্ঠার চার দশকের মধ্যে মোট ৩৮টি বিভাগ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এর মধ্যে কিছু বিভাগ সম্পূর্ণ স্বয়ংসম্পূর্ণ, আর কিছু নতুনভাবে গঠিত হয়েছে, যেমন দুটো বিভাগ। প্রত্যেক বিভাগে নিয়ম অনুযায়ী ২০ জন শিক্ষক থাকলে আওতায় থাকা ৩৮টি বিভাগে মোট ৭৬০ জন শিক্ষক প্রয়োজন। কিন্তু বর্তমানে সেখানে রয়েছেন মাত্র ৪১২ জন শিক্ষক। এই শিক্ষক সংকটের কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মান মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন নিয়োগ কার্যক্রম চালিয়ে যেতে চাইলেও, বিএনপি-পন্থী শিক্ষক সংগঠন ইউট্যাবের বাধা ও ছাত্রদলের প্রতিবাদে ক্যাম্পাসে নিয়োগ বোর্ডের কার্যক্রম স্থগিতের অভিযোগ ওঠেছে।

পাশাপাশি, গত সোমবার (২৬ জানুয়ারি) কমিউনিকেশন অ্যান্ড মাল্টিমিডিয়া জার্নালিজম বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ও প্রভাষক পদে নিয়োগ বোর্ডে সদস্য থাকলেও, বিভাগের সভাপতি আপগ্রেডিং বোর্ডে উপস্থিত থাকলেও প্রভাষক পদের নিয়োগ বোর্ডে অনুপস্থিত থাকায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে ক্ষোভ সৃষ্টি হয়। এ নিয়ে বন্ধুসভার নেতৃত্বে ছাত্ররা অফিসের সামনে বিক্ষোভ ও আন্দোলন চালায়, এবং প্রশাসন ভবনে তালা দেয়। বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের নেতারা ও সাধারণ শিক্ষার্থীরা এ বিক্ষোভে অংশ নেন।

শিক্ষক সংকটের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষার্থীরা জানায়, তাদের বিভাগে মাত্র দুজন শিক্ষক রয়েছেন, পরে একজনকে নিয়োগ দেওয়া হলেও এখনো পাঁচটি শিক্ষাবর্ষ চলমান রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে পাঠদান কার্যক্রমের মান কমে যাচ্ছে, শিক্ষকদের উপর অপ্রয়োজনীয় চাপ পড়ছে, এবং শিক্ষার্থীরা পর্যাপ্ত শিক্ষা গ্রহণে অসুবিধার মুখে পড়ছেন। একটি বিভাগের শিক্ষার্থী বলেন, “আমি পছন্দের বিষয়ে ভর্তি হয়েছিলাম, কিন্তু শিক্ষক সংকটে হতাশ হয়েছি। বর্তমানে অতিরিক্ত শিক্ষাবর্ষ থাকায় শিক্ষকরা নির্ধারিত সময়ে ক্লাস পারছেন না।”

বিশ্লেষণে জানা গেছে, কিছু বিভাগের শিক্ষকের সংখ্যা কম থাকায় একসাথে ছয় বা তার বেশি কোর্স নিতে হয়। এর ফলে গবেষণা ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রমে সময় বের করতে পারছেন না শিক্ষকরা। ফলে গুণগত শিক্ষার মান মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ণ হচ্ছে। কিছু বিভাগে দেখা গেছে, শিক্ষকরা পর্যাপ্ত ক্লাস নেন না, যা শিক্ষার্থীদের জন্য হতাশার কারণ।

একজন শিক্ষক বলেন, ‘শিক্ষক সংকটের কারণে বাইরে থেকে গেস্ট টিচার আনতে হয়, যা মানসম্মত পাঠদান নিশ্চিত করতে পারে না। এছাড়াও, কো-কারিকুলার কার্যক্রমও খুবই সীমিত হয়ে গেছে। এতে শিক্ষার্থীদের দক্ষ ও যোগ্য হিসেবে গড়ে ওঠার সম্ভাবনা কমে যায়।’

আইকিউএসি পরিচালক অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ নাজিমুদ্দিন বলেন, ‘কাউন্সিলের নিয়ম অনুযায়ী, প্রতি ব্যাচে ৪০ জনের বেশি শিক্ষার্থী থাকতে পারে না। আমাদের ছাত্রসংখ্যা বেশ থাকায়, আমরা দুই শিফটে ক্লাসের ব্যবস্থা করি, যার জন্য ১,০৮০ জন শিক্ষক দরকার। তবে বাস্তবে আমাদের উপলব্ধ শিক্ষকসংখ্যা এই চাহিদার তুলনায় অনেক কম। ফলে সেশনজট লেগে থাকে এবং নতুন বিভাগে ক্লাস চালু হয় না, শুধুমাত্র পরীক্ষা নেওয়া হয়। এতে শিক্ষার্থীরা পর্যাপ্ত শিক্ষা পায় না এবং মানসম্পন্ন শিক্ষক তৈরি করতে পারছি না।’

বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. রোকসানা মিলি বলেন, ‘প্রতিটি কোর্সে কমপক্ষে ৪০ ঘণ্টা ক্লাস হওয়া উচিত, কিন্তু রিসোর্সের অভাবে এটি সম্ভব হয় না। কোর্স সময়ের আগেই শেষ হয়ে যায়। শিক্ষার্থীদের ক্লাসের সঙ্গে আরও জড়িত থাকার পরিস্থিতি তৈরি করতে হলে শিক্ষক রিসোর্স বৃদ্ধি করতে হবে।’

উপাচার্য অধ্যাপক ড. নকীব মোহাম্মদ নসরুল্লাহ বলেন, ‘কোনো চাপ দেওয়া হয়নি। ইউট্যাব নিয়োগ বন্ধের জন্য চিঠি দিয়েছিল, তবে নিয়োগের বৈধ বোর্ডগুলো যথাযথভাবে পরিচালিত হবে।’

পোস্টটি শেয়ার করুন