মঙ্গলবার, ৩রা ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ২০শে মাঘ, ১৪৩২

অন্ধকারের বিরুদ্ধে আলোর আহ্বান নিয়ে শুরু হলো ‘জাতীয় কবিতা উৎসব’

মহান ভাষা আন্দোলনের স্মৃতিবাহী ফেব্রুয়ারি মাসের প্রথম দিনেই শুরু হলো ৩৮তম জাতীয় কবিতা উৎসব, যা অন্ধকারের বিরুদ্ধে আলোর বার্তা দিয়ে শুরু হয়। এই উৎসবের মূল স্লোগান হলো ‘সংস্কৃতিবিরোধী আস্ফালন রুখে দিবে কবিতা’। দুই দিনব্যাপী এই গুরুত্বপূর্ণ আয়োজনটি এই বছর প্রথমবারের মতো কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। রোববার (১ ফেব্রুয়ারি) সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সমাধিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে এ অনুষ্ঠানের সূচনা করা হয়।

এরপর এক বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়। এতে অংশ নেন কবিরা, যারা টিএসসি এলাকা ঘুরে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে যান। তাদের মধ্যে দৃশ্যমান ছিল সংস্কৃতির ধারক-বাহক, মাজার, বাউলদের আখড়া, এবং গণমাধ্যমের ওপর সাম্প্রদায়িক হামলার প্রতিবাদে মুখে লাল কাপড় বেঁধে অংশ নেন। তাদের হাতে ছিল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের, লালন সাঁইয়ের ও কাজী নজরুলের প্রতিকৃতিসম্পন্ন প্ল্যাকার্ড। তারা সন্ত্রাস ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে স্লোগান দিয়ে অন্ধকারের শক্তির বিরুদ্ধে আলোর ডাক দেন।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে জাতীয় সংগীত ও পতাকা উত্তোলনের মধ্য দিয়ে এই প্রেক্ষাপটের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। এর পরে ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’ গান ও এবারের উৎসবের সংগীত ‘এ সংগীত নৃত্য কবিতা/এ সম্প্রীতি সাম্যের বার্তা’ পরিবেশিত হয়।

অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন মুক্তিযুদ্ধের শহীদ মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধর বাবা, মীর মুস্তাফিজুর রহমান। তিনি বলেন, কবিরা কবিতার মাধ্যমে মানুষের মনোভাব প্রকাশ করেন। মানবতার দাবি তাদের অন্যতম মূল বিষয়। এই মানবিকতাকে সামনে রেখে সবাইকে মানবতার পক্ষে কাজ করতে হবে। মানুষকে মানুষের পাশে দাঁড়ানো উচিত, যাতে কেউ প্রাণ হারাতে না হয়।

মীর মুস্তাফিজুর রহমান আরও বলেন, শহীদরা দেশের স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক সমাজ গঠনে জীবন উৎসর্গ করেছেন। তাদের স্বপ্নের সে দিগন্ত পূরণের জন্য আমরাও একসাথে কাজ করে যেতে হবে। কবিরা লেখনী ও শব্দের মাধ্যমে জনগণে উৎসাহ ও অনুপ্রেরণা জোগাতে পারেন।

প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সংস্কৃতি বিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী। তিনি বলেন, চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান থেকে আমাদের শেখার অনেক কিছু রয়েছে। অতীত থেকে শিক্ষা না নিলে ভবিষ্যৎ উন্নয়ন কঠিন হয়ে পড়ে। সংস্কৃতি উপদেষ্টার ভাষায়, এই গণঅভ্যুত্থান ছিল একটি সাংস্কৃতিক আন্দোলন, যেখানে সব মতামত, সব জাতি ও গোষ্ঠীর অংশগ্রহণ ছিল। তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন, ভবিষ্যতের সরকারগুলোও এই বিভাজনমুক্ত এবং সংবেদনশীল সংস্কৃতি চর্চাকে ধরে রাখবে।

কবিতা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক ও শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক কবি রেজাউদ্দিন স্টালিন বলেন, যখনই কোনো জাতি সংকটের মুখোমুখি হয়েছে, তখনই কবিরা সাহসের সঙ্গে সামনে এসেছেন। এই সংগঠন রাজনৈতিক কোনও শক্তি নয়, বরং সংগ্রামের সময় দেশের মুক্তির জন্য কবিতার শক্তিকে ব্যবহার করেছে। তিনি আরও বলেন, আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে কবিরা জনগণকে আহ্বান জানিয়েছেন, সমাজকে গণতান্ত্রিক, অসাম্প্রদায়িক ও মুক্ত মানসিকতার পথে এগিয়ে যেতে।

উপস্থিত সভাপতির বক্তব্যে কবিতা পরিষদের সভাপতি কবি মোহন রায়হান বলেন, ১৯৮৭ সালে জরুরি গণতান্ত্রিক আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রের সড়ক মোহনা এবং রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে শুরু হয় এই বয়সের সংগঠন ও উৎসব। দীর্ঘদিন পরে এবার এই আয়োজনটি স্থানান্তরিত হয়েছে কারণ সময়ের পরিবর্তন এসেছে। বর্তমান সময়ে এক陰শক্তি এই ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতি অস্বীকার করে, হাজার বছরের বাংলা সংস্কৃতিকে মানতেই দিচ্ছে না।

অনুষ্টান শেষে স্বাগত বক্তব্য দেন কবি এ বি এম সোহেল রশিদ, শোকপ্রস্তাব পাঠ করেন কবি শ্যামল জাকারিয়া, এবং ঘোষণাপত্র পাঠ করেন কবি মানব সুরত। ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন কবি নূরুন্নবী সোহেল।

পোস্টটি শেয়ার করুন