শনিবার, ৭ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ২৪শে মাঘ, ১৪৩২

বাংলাদেশকে ছাড়াই শুরু হলো ইতিহাসের সবচেয়ে বিতর্কিত টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ

ভারত ও শ্রীলঙ্কার যৌথ আয়োজনে আজ থেকে পর্দা উঠেছে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের। তবে

মাঠের ব্যাট-বলের লড়াই ছাপিয়ে বিশ্ব ক্রিকেটের এই মহাযজ্ঞ এখন চরম বিতর্ক আর

অনিশ্চয়তার চাদরে ঢাকা। ইতিহাসের সব রেকর্ড ভেঙে এবারের টুর্নামেন্ট শুরু হয়েছে এক

নজিরবিহীন সংকটের মধ্য দিয়ে, যার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে আইসিসির পূর্ণ সদস্য

বাংলাদেশের অনুপস্থিতি। ক্রীড়াশৈলীর পরিবর্তে মাঠের বাইরের রাজনীতি ও কূটনৈতিক

টানাপোড়েনের শিকার হয়ে এবার বিশ্বমঞ্চ থেকে ছিটকে গেছে টাইগাররা, যা আন্তর্জাতিক

ক্রিকেট অঙ্গনে জন্ম দিয়েছে তীব্র ক্ষোভ ও সমালোচনার।

এবারের বিশ্বকাপে বাংলাদেশের না থাকা কোনো স্বাভাবিক ক্রিকেটীয় সিদ্ধান্ত ছিল না।

এর নেপথ্যে রয়েছে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যকার সাম্প্রতিক সময়ের অত্যন্ত জটিল কিছু

সমীকরণ। ঘটনার সূত্রপাত হয়েছিল ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগে (আইপিএল) বাংলাদেশি পেসার

মুস্তাফিজুর রহমানকে কেন্দ্র করে। কলকাতা নাইট রাইডার্স তাকে রেকর্ড মূল্যে দলে

নেওয়ার পর ভারতের একটি সংগঠনের বিক্ষোভের মুখে বিসিসিআই মুস্তাফিজকে বাদ দেওয়ার

নির্দেশ দেয়। এর ফলে পুরো বাংলাদেশ জাতীয় দল, কোচিং স্টাফ ও সমর্থকদের ভারতে

অবস্থানকালীন নিরাপত্তা নিয়ে বড় ধরনের উদ্বেগ তৈরি হয়। নিরাপত্তাজনিত এই সংকটের

সমাধান না হওয়ায় বাংলাদেশ দল ভারতে গিয়ে ম্যাচ খেলতে অসম্মতি জানায়। কিন্তু আইসিসি

কোনো নমনীয়তা না দেখিয়ে বা বিকল্প ভেন্যুর প্রস্তাব না দিয়ে উল্টো বাংলাদেশকে

টুর্নামেন্ট থেকে বাদ দিয়ে স্কটল্যান্ডকে অন্তর্ভুক্ত করে। আইসিসির এমন একপাক্ষিক

সিদ্ধান্তের পেছনে ভারতের প্রভাবশালী ভূমিকা রয়েছে বলে মনে করছেন ক্রিকেট

সংশ্লিষ্টরা।

বাংলাদেশের প্রতি এই অন্যায়ের প্রতিবাদে আন্তর্জাতিক মহলে শুরু থেকেই সমালোচনা

চলছে। টুর্নামেন্ট শুরুর ঠিক আগে সাবেক ইংলিশ অধিনায়ক ও খ্যাতনামা ধারাভাষ্যকার

নাসের হুসেইন বাংলাদেশের অবস্থানের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। তিনি মনে করেন,

মুস্তাফিজুর রহমানের মতো একজন ক্রিকেটারের পাশে দাঁড়িয়ে বিসিবি যে সাহসিকতা

দেখিয়েছে তা প্রশংসার যোগ্য। তিনি স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, বিসিসিআই-এর অযাচিত

হস্তক্ষেপই এই সংকটের মূল কারণ। মূলত বিশ্ব ক্রিকেটে ভারতের একক আধিপত্যের কারণে

অনেক দেশ এ নিয়ে সরাসরি মুখ না খুললেও নাসের হুসেইনের মতো ব্যক্তিত্বরা বিষয়টিকে

জনসমক্ষে নিয়ে এসেছেন।

বাংলাদেশের অনুপস্থিতির এই সংকটে নতুন মাত্রা যোগ করেছে পাকিস্তান। বাংলাদেশের পাশে

দাঁড়িয়ে তারা ভারতের বিপক্ষে পূর্বনির্ধারিত হাই-ভোল্টেজ ম্যাচটি বয়কটের চূড়ান্ত

সিদ্ধান্ত নিয়েছে। পাকিস্তান সরকারের এই সিদ্ধান্তের ফলে আইসিসি এখন হাজার হাজার

কোটি টাকার আর্থিক লোকসানের মুখে দাঁড়িয়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে আইসিসি ইতোমধ্যে

ভারত-পাকিস্তান ম্যাচের টিকিট বিক্রি বন্ধ করে দিয়েছে এবং পর্দার আড়ালে পাকিস্তানের

সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। তবে পাকিস্তান তাদের অবস্থানে অনড় থাকায় এবারের

বিশ্বকাপের জৌলুস ও আকর্ষণ অনেকটাই ম্লান হয়ে গেছে। ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় বিজ্ঞাপন

হিসেবে পরিচিত ভারত-পাকিস্তান লড়াই যদি শেষ পর্যন্ত মাঠে না গড়ায়, তবে এটি হবে

টুর্নামেন্টের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বিপর্যয়।

মাঠের লড়াই ছাপিয়ে রাজনীতির এই কালো ছায়া সবচেয়ে বেশি ব্যথিত করেছে বাংলাদেশের কোটি

কোটি ক্রিকেটপ্রেমীকে। উৎসবের বদলে এবারের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ এখন এক বড় ধরনের

প্রশ্নের সম্মুখীন। নিয়মিত একটি সদস্য রাষ্ট্রকে বাদ দিয়ে এবং রাজনৈতিক প্রভাবকে

প্রশ্রয় দিয়ে আইসিসি তার নিজস্ব নিরপেক্ষতা হারিয়েছে বলে মনে করছেন ক্রীড়া

বিশ্লেষকরা। সব মিলিয়ে, ভারত ও শ্রীলঙ্কার মাঠে খেলা শুরু হলেও, ক্রিকেটের যে

স্পিরিট বা মূল সৌন্দর্য—তা এই বিতর্কের আড়ালে অনেকটা ঢাকা পড়ে গেছে। এই বিশ্বকাপ

শেষ পর্যন্ত সফলভাবে সম্পন্ন হবে কি না, তা নিয়ে এখন গোটা বিশ্বই সন্দিহান।

পোস্টটি শেয়ার করুন