বুধবার, ১৮ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ৫ই ফাল্গুন, ১৪৩২

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্বাক্ষরিত পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি দেশের স্বার্থবিরোধী: ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদদের আহ্বান পর্যালোচনার

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মেয়াদের শেষ সময়ে এসে দ্রুত সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্বাক্ষরিত ‘এগ্রিমেন্ট অন রেসিপ্রোকাল ট্রেড’ বা পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তিটি নিয়ে দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ী, শিল্পোদ্যোক্তা ও অর্থনীতিবিদরা তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তারা অভিযোগ করেছেন, এই চুক্তিতে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থের অপসারণ ঘটিয়ে মার্কিন স্বার্থগুলো প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে, পাশাপাশি বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) গুরুত্বপূর্ণ নীতিমালা উপেক্ষা করা হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীতে বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজ (বিসিআই) আয়োজিত এক আলোচনাসভায় বক্তারা এই চুক্তির পুনঃবিবেচনার জন্য নবগঠিত ও নির্বাচিত সরকারের প্রতি জোর আহ্বান জানান।

বিসিআই সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরীর (পারভেজ) সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সভায় অর্থনীতিবিদ ও শিল্পোদ্যোক্তা বিভিন্ন নেতিবাচক দিক তুলে ধরেন। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন যে, এই চুক্তির ফলে মার্কিন বাজারে বাংলাদেশের পণ্য যদি সেখানকার প্রচলিত দাম থেকে কম হয়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ থাকবে। ফলে রপ্তানিকারকরা নির্দিষ্ট প্রতিযোগিতায় পড়বেন, যা দেশের জন্য উদ্বেগজনক। তিনি মনে করেন, বড় সম্ভাবনার কথা বলা হলেও ভেতরে থাকা শর্তগুলো দেশের অর্থনীতির জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।

পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) জ্যেষ্ঠ ফেলো ড. মোস্তফা আবিদ খান বলেন, দেশের সার্বভৌমত্ব ও অর্থনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এই গুরুত্বপূর্ণ চুক্তির আগে সংসদ থেকে অনুমোদন নেওয়া হয়নি। শেতেহ তারা বলেন, অরাজনৈতিক সরকার হলে বিষয়টি আলোচনার পর্যায়ে রাখা উচিৎ ছিল যেন পরবর্তী সময়ের নির্বাচিত সরকার ভালো করে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে সিদ্ধান্ত নিতে পারে। তিনি অভিযোগ করেন, যেখানে বাংলাদেশের স্বার্থ রাখা হয়েছে সেই অংশগুলোতে ডব্লিউটিওর নীতিমালা মানা হয়নি, বরং মার্কিন স্বার্থের জন্য কঠোরভাবে অনুসরণ করা হয়েছে।

সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন এই আলোচনাতেও যোগ দিয়ে বলেন, এই চুক্তি অত্যন্ত গোপনীয়তা আর তাড়াহুড়ো করে স্বাক্ষর করা হয়েছে, যেখানে রপ্তানিকারকদের স্বার্থকে পুরোপুরি উপেক্ষা করা হয়েছে।

সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেম) এর নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রায়হান বলেন, চুক্তির অস্পষ্টতা বেশ স্পষ্ট। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের কটন ব্যবহারে শুল্কমুক্ত সুবিধা প্রসঙ্গে বিভ্রান্তি রয়েছে। তাঁর মতে, মার্কিন অর্থনীতির নিরাপত্তার জন্য এই চুক্তিতে বেশি জোর দেওয়া হয়েছে, এবং সাধারণ শুল্ক কাঠামোর চেয়ে পাল্টা শুল্ক বা অপ্রত্যাশিত শুল্কের বিষয়টিও এখানে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্টের (র‌্যাপিড) চেয়ারম্যান এম এ রাজ্জাক পরামর্শ দেন, পরবর্তী আলোচনার জন্য কোনো অভিজ্ঞ আইনি প্রতিষ্ঠানকে যুক্ত করা উচিত যাতে দেশের স্বার্থ সুরক্ষিত থাকে।

বাণিজ্য চুক্তির ভবিষ্যতের বিষয়ে এপেক্স ফুটওয়্যার এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর বলেন, এই চুক্তি অবশ্যই নতুন গঠিত জাতীয় সংসদে বিস্তারিত পর্যালোচনার পর অনুমোদন দেওয়া উচিত। তিনি মার্কিন সুপ্রিম কোর্টের ট্যারিফ সম্পর্কিত আসন্ন রায় ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের রাজনৈতিক প্রভাবের কথা উল্লেখ করে সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দেন। প্লামি ফ্যাশনসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফজলুল হকও মনে করেন, চুক্তির মাধ্যমে যে সুবিধা পাওয়ার আশা করা হচ্ছে, বাস্তবে তা পাওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। তাই নতুন সরকারের উচিত হবে সকল অংশীজনের মতামত নিয়ে চুক্তিটিকে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন বা সংশোধনের উদ্যোগ গ্রহণ করা। সামগ্রিকভাবে আলোচনা থেকে দেখা যায়, দেশের স্বার্থের সঙ্গে মানানসই অপ্রয়োজনীয় বা নিছক সুবিধাবাদী চুক্তি দীর্ঘমেয়াদে দেশের অর্থনীতির জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়াতে পারে।

পোস্টটি শেয়ার করুন