অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্বে থাকা শেষ মুহূর্তগুলো দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা জন্য চ্যালেঞ্জের সঙ্গী হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরকার অপ্রত্যাশিত ও বড় অঙ্কের বিভিন্ন প্রকল্প অনুমোদনসহ জরুরি নয় এমন বেশ কিছু দায়িত্বশীল সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা দেশের অর্থনীতিকে আরো বেশি দুর্বল করে তুলতে পারে বলে বিশ্লেষকরা সতর্ক করছেন। এসব সিদ্ধান্তের মধ্যে থাকছে বিপুল বাজেট ব্যয়, বিদেশি ঋণের বহুগুণ বৃদ্ধি এবং বড় বড় নতুন প্রকল্পের অনুমোদন।
বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার পরে অন্তর্বর্তী সরকার মূলত রুটিন কাজের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকার কথা থাকলেও, গত ২৫ দিনে প্রায় এক লাখ ছয় হাজার ৯৯৩ কোটি টাকা ব্যয়ের ৬৪টি প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে বড় অংশের প্রকল্পগুলো নতুন, যার মোট ব্যয় প্রায় দুই লাখ টাকা ছাড়িয়ে গেছে। এ সময়ের মধ্যে সরকার আরও বড় বড় প্রকল্পে বিদেশি অর্থায়ন ও ঋণের উপর নির্ভরশীলতা আরও বাড়িয়েছে। বিবরণ অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছর শেষে সরকারি ঋণের পরিমাণ দাঁড়াবে প্রায় ৭৭ বিলিয়ন ডলার, যা গত পাঁচ বছরে প্রায় ৪৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এই ঋণের বোঝার বোঝা যদি আইএমএফ ও অন্যান্য গ্যারান্টি যুক্ত হয়, তবে বাস্তবে দায় যে আরও বেশি হবে, তা বলাই বাহুল্য।
অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করে বলছেন, এই ঋণ বোঝা অচিরেই দেশের অর্থনীতির জন্য বড় অঙ্কের চাপ সৃষ্টি করবে। বিশ্লেষকদের মতে, ভবিষ্যৎবাণীতে আরও বড় ঝুঁকি দেখানো হচ্ছে, যার মধ্যে রয়েছে নতুন পে স্কেল বা বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের ফলে বছরে অতিরিক্ত এক লাখ ছয় হাজার কোটি টাকা খরচ।
বাজেটের এই চাপের পাশাপাশি বিদেশি চুক্তি ও বড় প্রকল্পের অনুমোদনও দেশান্তর করছে অস্থিরতা। অতীতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন বাণিজ্য চুক্তির অংশ হিসেবে বোয়িং থেকে ২৫টি নতুন উড়োজাহাজ কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, যেখানে বর্তমানে ১৪টি উড়োজাহাজ কেনা হবে বলে জানানো হচ্ছে। এর জন্য সম্ভাব্য খরচ ৩০ থেকে ৩৫ হাজার কোটি টাকা। উড়োজাহাজগুলো সরবরাহ শুরু হতে পারে ২০৩১ থেকে ২০৩৫ সালের মধ্যে, অর্থাৎ বর্তমান সরকারের সময় এর সুফল পাওয়া সম্ভব হবে না। এছাড়া চীন থেকে চারটি নতুন জাহাজ ক্রয় ও যুক্তরাজ্যের সঙ্গে জিটুজি ভিত্তিতে নৌসদর দপ্তরের জন্য একটি হাইড্রোগ্রাফিক সার্ভে ভেসেল কেনার চুক্তি হয়েছে। এসব চুক্তির ব্যয় মোট প্রায় ২৪ কোটি ডলার।
বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রশাসনিকভাবে এক লাখ কোটি টাকার বেশি আর্থিক দায় তৈরি করা সময়ের অনুকূলে ছিল না। বিশেষ করে বড় বড় প্রকল্পের অনুমোদনে বা বাজেটের বড় পরিবর্তনে নির্বাচিত সরকারই সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত ছিল। বিশ্লেষকরা আশঙ্কা প্রকাশ করছেন যে, এইসব অপ্রয়োজনীয় আর্থিক সিদ্ধান্ত ও অপ্রত্যাশিত ঋণে পরবর্তী সরকারের জন্য বিপদ আরও বাড়বে।
সিপিডির গবেষণা পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম খান দাবি করেছেন, জরুরি নয় ও দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিগুলো এড়িয়ে যাওয়া উচিত ছিল। যথাযথ আলোচনা ও পরিকল্পনা ছাড়া এই ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়া অপ্রয়োজনীয় ঝুঁকি সৃষ্টি করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, গত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতা অর্জনে যে সফলতা আলোচিত ছিল, তা এখন এক বড় প্রশ্নের মুখে দাঁড়িয়েছে। তবে অনেকে মনে করেন, এই সিদ্ধান্তগুলো অনিচ্ছাকৃত বা অপ্রয়োজনীয় ছিল, কারণ শেষ মুহূর্তে খুব তাড়াহুড়ো করে খসড়া পরিকল্পনা নেওয়া হয়।
অতিরিক্ত ঋণের দায় ও অপ্রয়োজনীয় প্রকল্পের অনুমোদনের কারণে দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি আরও সংকটাপন্ন হয়ে পড়েছে। ভবিষ্যতের জন্য টেকসই ও স্থিতিশীল অর্থনীতি নিশ্চিত করতে বর্তমান পরিস্থিতি থেকে শেখার প্রয়োজন রয়েছে।





