ফিলিস্তিনের গাজায় ৩৫০ একরের বেশি এলাকা জুড়ে একটি বিশাল সেনা ঘাঁটির নির্মাণ পরিকল্পনা যাচ্ছে ট্রাম্প প্রশাসনের। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রস্তাবিত বোর্ড অব পিসের বিভিন্ন নথি পর্যালোচনায় দ্য গার্ডিয়ান জানিয়েছে, এই নতুন ঘাঁটি হলো প্রস্তাবিত আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনী (আইএসএফ) এর জন্য মূল অপারেশন বেস হিসেবে কাজ করবে। এই বাহিনী গাজার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং সেখানে শান্তি প্রতিষ্ঠায় কাজ করবে। তবে এর কার্যপরিধি, হামাসের নিরস্ত্রীকরণ ও জমির মালিকানা প্রসঙ্গে নানা প্রশ্ন উত্থাপিত হচ্ছে। বিরোধীরা কেউ বলছেন, এই ধরনের স্থাপনা নির্মাণ সম্পূর্ণভাবে ফিলিস্তিনি সরকারের অনুমতি ছাড়া হলে এটি দখলদারির মতোই বলে মনে হতে পারে। ট্রাম্প প্রশাসন এ বিষয়ে মতামত প্রকাশ থেকে বিরত রয়েছে।
আধুনিক এই স্থাপনা হবে একটি দুর্গ সদৃশ সামরিক ঘাঁটি, যার চূড়ান্ত আকার হবে ১,৪০০ মিটার x ১,১০০ মিটার। চারপাশে থাকছে ২৬টি ট্রেইলার-মাউন্টেড সাঁজোয়া নজরদারি টাওয়ার, ছোট অস্ত্রের প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, বাঙ্কার ও সামরিক সরঞ্জামের গুদাম। পুরো ধ্বংসপ্রাপ্ত এলাকাটি কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে ঘিরে রাখা হবে। এই পরিকল্পনা অনুযায়ী, দক্ষিণ গাজার শুষ্ক অঞ্চলটিতে এমন একটি স্থাপনা নির্মাণের চিন্তাভাবনা চলছে, যেখানে লবণাক্ত ঝোপঝাড় ও সাদা ব্রুম গাছ রয়েছে, যা ইসরায়েলি বোমাবর্ষণ দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে বিভিন্ন ধাতব আবর্জনায় ভরে গেছে। গার্ডিয়ান এই এলাকার ভিডিও ফুটেজও পর্যালোচনা করেছে।
সংবাদসূত্রের খবরে বলা হয়, ইন্দোনেশিয়া সর্বোচ্চ ৮ হাজার সেনা পাঠানোর প্রস্তাব দিয়েছে। পাশাপাশি, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম রাষ্ট্রটি ওয়াশিংটনে অনুষ্ঠিত বোর্ড অব পিসের উদ্বোধনী বৈঠকে অংশ নেওয়ার জন্য প্রস্তুত। জাতিসংঘের অনুমোদনে গাজায় একটি অস্থায়ী আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনী (আইএসএফ) গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এই বাহিনী হবে গাজার সীমান্ত সুরক্ষা, অভ্যন্তরীণ শান্তি রক্ষায় কাজ করবে, বেসামরিক নাগরিকদের নিরাপত্তা দেবে ও যাচাইকৃত ফিলিস্তিনি পুলিশ বাহিনীকে প্রশিক্ষণ ও সহায়তা প্রদান করবে।
বিশ্বের ২০টির মতো দেশ এই বোর্ডের সদস্য হয়ে থাকলেও, ব্যাপকাংশ এই উদ্যোগে সম্পৃক্ত হয়নি। এর কার্যকারিতা নিয়ে সমালোচকরা বলছেন, এই বোর্ডের অধিকাংশ পরিকল্পনা ট্রাম্পের নেতৃত্বে বাস্তবায়িত হচ্ছে এবং এর অর্থায়ন ও শাসন কাঠামো অস্পষ্ট। গার্ডিয়ান সংবাদমাধ্যমের কিছু উপদেষ্টার বরাত দিয়ে জানায়, মার্কিন কর্মকর্তারা এই আলোচনাগুলো প্রায়ই সরকারি ইমেইলে নয়, ‘সিগন্যাল’ অ্যাপে করে থাকেন।
এদিকে, গাজায় হামাসের ক্ষমতা ফিরে পেয়েছে। যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার চার মাস পরেও হামাসের লড়াই থেমে থাকেনি। বেড়ে চলা এই সংঘাতে তারা এখন নিজেদের নিয়ন্ত্রণ পুনঃপ্রতিষ্ঠার দিকে মনোযোগী। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি অনুযায়ী, এই সময়ের মধ্যে হামাসের অঙ্গসংগঠনগুলো ভেঙে গেরিলা বাহিনীতে রূপান্তরিত হয়েছে। অধিকাংশ নেতা নিহত হয়েছে, গাজার ভবন ও অবকাঠামো ব্যাপকহারে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে, মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে, আর অর্থনৈতিক কার্যক্রম ভেঙে পড়েছে। আক্রান্ত এলাকার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুযায়ী, ইসরায়েলি হামলায় গাজাবাসীর মধ্যে ৭২ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন।
গাজা এলাকায় এখন দেখা যাচ্ছে, হামাস নীতিমালা ও নিয়ন্ত্রণ আবারও জোরদার হতে শুরু করেছে। নাগরিকরা বলছেন, নিরাপত্তা, কর ও সরকারি পরিষেবায় তারা আবারও বিভাজন ও নিয়ন্ত্রণের দৃঢ়তা লক্ষ্য করছেন। গাজায় কাজের বাজারে পুলিশের টহল ও অপ্রচলিত নিয়ন্ত্রণ বেড়েছে। অনেক দোকানির ভাষ্য, নিজের নিরাপত্তার জন্য হামাসের উপস্থিতি আবার দৃশ্যমান। কেউ কেউ বলছেন, পুলিশ গেলে জরিমানা বা জেল হচ্ছে। শহরজুড়ে সরকারি ফি ও করের চাপ বাড়ছে। শহরের পূর্বের শুজাইয়া এলাকা থেকে তাদের কয়েকজন জানিয়েছেন, তারা এখন নিজ বাড়ি ছাড়া অন্য কোথাও যেতে পারেন না। সেখানে তাদের দোকান ভাঙচুর হয়েছে বা ধ্বংসস্তুপে পরিণত হয়েছে।
প্রতিদিনই পুলিশ ও সরকারি সংস্থাগুলি গাজার বাজারে জরিপ চালাচ্ছে। পণ্য সামগ্রী ও বিক্রির উপর কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। কিছু ব্যবসায়ীরা বলছেন, আমদানির উপর আবারও কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়েছে। যদিও খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের সরবরাহ দীর্ঘদিনের মতো স্বাভাবিক থাকলেও, হামাসের অঙ্গ সংগঠনগুলো এই নিয়ন্ত্রণ জোরদার করেছে।





