রবিবার, ২২শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ৯ই ফাল্গুন, ১৪৩২

নিষেধাজ্ঞা কাটিয়ে চীন হয়ে রাশিয়ায় বিদেশি গাড়ির ব্যাপক বিক্রি: বিকল্প বাণিজ্যপথের সফলতা

ইউক্রেন যুদ্ধের ফলে পশ্চিমা দেশগুলোর কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে রাশিয়ার বাজারকে বৈশ্বিক বাণিজ্য থেকে বিচ্ছিন্ন করার প্রচেষ্টা চললেও বাস্তব চিত্র অনেকাংশে ভিন্ন। বিশেষ করে অটোমোবাইল বা গাড়ি শিল্পে এই নিষেধাজ্ঞাগুলি কার্যত কার্যকারিতা হারাচ্ছে চীনের কেন্দ্র করে গড়ে উঠা এক বিশাল ‘গ্রে মার্কেট’ বা অনানুষ্ঠানিক বাণিজ্য পথে। এই কারণে, বিশ্বখ্যাত টয়োটা, মাজদা, মার্সিডিজ-বেঞ্জ, বিএমডব্লিউ কিংবা ফক্সওয়াগনের মতো ব্র্যান্ডের গাড়িগুলো এখন সরাসরি রফতানি না করেও চীনের মধ্যস্থতা দিয়ে নিয়মিত রাশিয়ার শোরুমগুলোতে পৌঁছে যাচ্ছে। রয়টার্সের সাম্প্রতিক অনুসন্ধানমূলক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, নিষেধাজ্ঞার বেড়াজাল ভেঙে বিকল্প পথে রুশ অর্থনীতিকে সচল রাখার এই চাঞ্চল্যকর পরিস্থিতি।

রাশিয়ার অটোমোবাইল গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘অটোস্ট্যাট’-এর তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, পশ্চিমা ও জাপানি কোম্পানিগুলো সরাসরি রাশিয়ায় ব্যবসা বন্ধ করলেও দেশের বাজারে এই ব্র্যান্ডের গাড়ির চাহিদা একটুও কমেনি। বরং রুশ ডিলাররা সরাসরি নির্মাতার ওপর নির্ভর না করে চীনের শক্তিশালী ব্যবসায়ী নেটওয়ার্কের মাধ্যমে গাড়ি সংগ্রহ করে চলছেন। এর অন্যতম বড় মাধ্যম হলো চীনে তৈরি নামীদামী বিদেশী ব্র্যান্ডের গাড়ি। আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলো যখন তাদের চীনা অংশীদারদের সঙ্গে মিলে স্থানীয় বাজারের জন্য গাড়ি উৎপাদন করে, তখন সেই গাড়িগুলোর বড় এক অংশ এখন কৌশলে রাশিয়ার সীমান্তবর্তী এলাকায় সরবরাহ করা হচ্ছে। এছাড়াও, অন্যান্য দেশে উৎপাদিত গাড়ি চীনের বন্দরগুলো দিয়ে ট্রানজিট করে মস্কোতে পৌঁছে যাচ্ছে।

নিষেধাজ্ঞার কঠোর আইনি জটিলতা এড়াতে ব্যবসায়ীরা এক অভিনব কৌশল অবলম্বন করেছেন। প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, নতুন ও চকচকে গাড়িগুলো কাগজে-কলমে ‘ব্যবহৃত গাড়ি’ হিসেবে নিবন্ধন করা হয়। প্রথমবার চীনে নিবন্ধন করার পর সেই গাড়িগুলোকে দ্বিতীয় হ্যান্ড বা ব্যবহৃত হিসেবে দেখিয়ে রাশিয়ায় রফতানি করা হয়। এর ফলে, মূল গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর অনুমতির প্রয়োজন পড়েনা এবং তারা আইনি দায়বদ্ধতা থেকে নিজেদের মুক্ত রাখতে পারেন। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালে রাশিয়ায় বিক্রি হওয়া প্রায় ১ লাখ ৩০ হাজার বিদেশী গাড়ির অর্ধেকের বেশি এই চীন রুট ব্যবহার করে দেশটিতে প্রবেশ করেছে। ২০২২ সালের যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত এই পদ্ধতিতে সাত লাখের বেশি বিদেশী ব্র্যান্ডের গাড়ি রাশিয়ায় বিক্রি হয়েছে।

অন্যদিকে, মার্সিডিজ-বেঞ্জ, বিএমডব্লিউ ও ফক্সওয়াগনের মতো শীর্ষস্থানীয় গাড়ি নির্মাতা সংস্থাগুলো দাবি করেছে যে, তারা রাশিয়ায় কোনও পণ্য বিক্রি পুরোপুরি বন্ধ রেখেছে এবং অনানুষ্ঠানিক রফতানি ঠেকানোর জন্য তারা তৎপর। তবে, তারা স্বীকার করেছে যে, তৃতীয় পক্ষ বা মধ্যস্বত্বভোগীদের মাধ্যমে এই গোপন সরবরাহ বন্ধ করানো অনেক কঠিন এবং সময়সাপেক্ষ। বিএমডব্লিউ জানিয়েছে, এইসব গাড়ি মূলত তাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে যাচ্ছে এবং রাশিয়ার ধনী গ্রাহকদের মধ্যে পশ্চিমা ব্র্যান্ডের প্রতি বিশেষ আগ্রহ থাকায় ডিলাররা এই সমান্তরাল আমদানি কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।

ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্র এই গোপন বাণিজ্য প্রবাহ বন্ধ করতে নজরদারি বাড়ালেও, বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই বিকল্প পথের সংখ্যা এতটাই বেশি যে তা পুরোপুরি বন্ধ করা এখনই সম্ভব হচ্ছে না। চীনের অভ্যন্তরীণ বাজারে গাড়ির ব্যাপক উদ্বৃত্ত রয়েছে এবং সরকার রফতানিতে নানা ধরনের ভর্তুকি সুবিধা দিচ্ছে, ফলে ব্যবসায়ীরা এই সুযোগটি কাজে লাগাচ্ছেন। ফলে, বিশ্ব রাজনীতির মেরুকরণ ও নিষেধাজ্ঞার পাহাড় ডিঙিয়ে রাশিয়ার রাস্তায় এখনও আধুনিক ও দামী বিদেশী গাড়ি চলতে দেখা যাচ্ছে, যা রাশিয়ার অর্থনীতির স্থিতিস্থাপকতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত। এই পরিস্থিতি পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কার্যকারিতা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্নও তুলছে।

পোস্টটি শেয়ার করুন