বিশ্বখ্যাত বিনিয়োগকারী ও অর্থনীতির প্রবাদপ্রতিম ব্যক্তিত্ব ওয়ারেন বাফেটের প্রতিষ্ঠান বার্কশায়ার হ্যাথেওয়ে দীর্ঘ ছয় বছর পর আবারও সংবাদপত্র শিল্পে বড় ধরনের বিনিয়োগের মাধ্যমে ফিরে এসেছে। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ গণমাধ্যম ‘নিউইয়র্ক টাইমস’-এর শেয়ার কিনেছে এই কোম্পানি, যার পরিমাণ ৩৫ কোটি মার্কিন ডলার। এই তথ্যটি জানা গেছে এরইমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছে ২০২৫ সালের শেষ প্রান্তিকের শেয়ার তালিকা প্রকাশের সময়। বিশেষ বিষয় হলো, বাফেটের এই বড় বিনিয়োগটি তার কর্মজীবনের শেষ পর্বে ঘটেছে, যার ফলে এটি তার শেষ সময়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সিদ্ধান্ত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, এই বিনিয়োগের মাধ্যমে নিউইয়র্ক টাইমসের নতুন দিকচিহ্ন ও ডিজিটাল রূপান্তরকে তিনি সম্পূর্ণ স্বীকৃতি দিয়েছেন। ছয় বছর আগে, ২০২০ সালে, বাফেট সাংবাদিকতা খাতের ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন। তখন বেশিরভাগ সংবাদপত্র বিক্রি করে দিয়ে এই খাতে তার বিনিয়োগ থেকে সরে এলেও, নিউইয়র্ক টাইমস ও ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের মতো শক্তিশালী জাতীয় ব্র্যান্ডগুলো টিকে থাকার সক্ষমতা অনুযায়ী বিশ্বাস প্রকাশ করেছিলেন। কিন্তু এখন তার এই পুনর্বিনিয়োগ প্রমাণ করে যে, নিউইয়র্ক টাইমস তার ব্যাবসায়িক রূপান্তর ও সফল ডিজিটাল কৌশলের ওপর আস্থা বজায় রেখেছে।
বাজার বিশ্লেষকরা বলেছেন, সম্প্রতি নিউইয়র্ক টাইমস নিজেকে দুনিয়াজোড়া ডিজিটাল সংবাদ ও বিনোদন প্ল্যাটফর্মে রূপান্তর করতে সক্ষম হয়েছে। তাদের ১ কোটির বেশি ডিজিটাল গ্রাহক রয়েছে, পাশাপাশি অনলাইন গেমস, শব্দধাঁধা ও ক্রীড়াভিত্তিক প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে আয় বাড়িয়েছেন। উন্নত মানের সাংবাদিকতা ও ডিজিটাল কৌশলে এই সংবাদ প্রতিষ্ঠানটি এখন বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয়। এই বিনিয়োগকে বিশেষ করে ‘পূর্ণ চক্র’ হিসেবে অভিহিত করেছেন টিম ফ্র্যাঙ্কলিন, একজন শীর্ষস্থানীয় অধ্যাপক। তিনি বলেছেন, বাফেটের এই সিদ্ধান্ত অন্য ক্ষতিগ্রস্ত স্থানীয় পত্রিকাগুলোর জন্য এক ফলপ্রসূ শিক্ষা হতে পারে। এই খবর প্রকাশের পরে, নিউইয়র্ক টাইমসের শেয়ার মূল্য দ্রুত বৃদ্ধি পায়।
অপরদিকে, বার্কশায়ার তার পোর্টফোলিওতেও বড় পরিবর্তন এনেছে। তারা জ্বালানি তেল খাতের বড় কোম্পানি শেভরনের শেয়ার উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছে। এই সিদ্ধান্তের পেছনে ভেনেজুয়েলার সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রভাব রয়েছে। প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো অপসারিত হওয়ার পর দেশটির বিশাল তেল সম্পদের ওপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ বেড়ে যায়, যার ফলে এই শেয়ারের মূল্য এ বছর প্রায় ২৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এই পরিবর্তিত ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতিতে, তেল খাতে লাভবান হওয়ার লক্ষ্যেই এই বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে, প্রযুক্তি ও ব্যাংকিং খাতে কিছুটা সাবধানতা অবলম্বন করেছে বার্কশায়ার। গত প্রান্তিকে তারা তাদের হাতে থাকা অ্যাপল ও ব্যাংক অব আমেরিকার শেয়ার বিক্রি করেছে। তবে বিক্রির পরও, অ্যাপলের মোট ২২.৮ কোটির বেশি এবং ব্যাংক অব আমেরিকার ৮ কোটির বেশি শেয়ার তাদের কাছে রয়ে গেছে। এ ছাড়া, জেইকো বিমা, বিএনএসএফ রেলওয়ে, ডেইরি কুইনসহ নানা প্রতিষ্ঠানের মাঝেও তাদের মালিকানা রয়েছে। বাফেটের উত্তরসূরিরা কীভাবে এই নতুন বিনিয়োগ কৌশল চালিয়ে যাবে, তা বিশ্ব অর্থনীতির জন্য এখন প্রধান আলোচনার বিষয়।





