সোমবার, ২৩শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ১০ই ফাল্গুন, ১৪৩২

বিশ্বের জন্য এবার ১৫% শুল্ক আরোপের ঘোষণা ট্রাম্পের

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ওপর নতুন করে ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেওয়ার এক দিনের মধ্যে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তা আরও ৫ শতাংশ বৃদ্ধি করে মোট ১৫ শতাংশে নিয়ে এসেছেন। গত শনিবার, ২১ ফেব্রুয়ারি, ট্রাম্প সোশ্যাল ট্রুথে এক পোস্টে এই শুল্ক বাড়ানোর সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছেন। এর আগে, শুক্রবার, যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট ট্রাম্পের দ্বারা আরোপিত শুল্কগুলো অবৈধ ঘোষণা করার পর তিনি নিজের স্বাক্ষরিত নথিপত্রে ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছিলেন। একই সঙ্গে তিনি এই সিদ্ধান্তের জন্য সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের তীব্র সমালোচনা করেন। বিচারপতিদের কাছে এই শুল্ক আরোপ ‘জাতির জন্য অপমানজনক’ বলে অভিহিত করেন ট্রাম্প।

নিউইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে, সুপ্রিম কোর্টের এই রায়ের একদিন পরে, ট্রাম্প ঘোষণা করেন যে তিনি দেরি না করে বিশ্বব্যাপী শুল্ক ১৫ শতাংশে উন্নীত করবেন। তিনি তাঁর পোস্টে বলেন, ‘এই নীতিটি অবিলম্বে কার্যকর হবে। বড় ধরনের আইনি বাধা সত্ত্বেও আমি বাণিজ্য যুদ্ধ চালিয়ে যাব।’

দ্য গার্ডিয়ান অনলাইন জানিয়েছে, ট্রাম্প এই ১৫ শতাংশ শুল্ক আরোপের জন্য পাঁচ দশকের বেশি পুরানো একটি আইনের প্রাচীন ধারা পুনরুজ্জীবিত করেছেন। তিনি বলেন, ‘অবিলম্বে ১৯৭৪ সালের বাণিজ্য আইনের ১২২ ধারার অধীনে এই শুল্ক বৃদ্ধি কার্যকর হবে। এছাড়াও তিনি অন্যান্য অবৈধ বাণিজ্য অনুশীলনের তদন্ত শুরু করবেন।’ ট্রাম্প জোর দিয়ে বলেন, ‘আমি মার্কিন কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়াই এই ক্ষমতা রাখি এবং অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করতে পারি।’

অতীতে সুপ্রিম কোর্ট মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বিভিন্ন দেশের পণ্যে ট্রাম্পের শুল্ক আরোপের প্রশ্ন তুলে জানিয়েছিল, তিনি ১৯৭৭ সালের এক আইনের ধারার কোনো বিধান অনুযায়ী এই শুল্ক আরোপের জন্য অনুমোদন নেননি। আদালত জানিয়েছে, ট্রাম্পের এই আইনতদ্ব্যর্থতা অবৈধ। তার এই নির্দেশনা অমান্য করার জন্য মার্কিন কংগ্রেসের অনুমোদন আবশ্যক। এই বিষয়ে ট্রাম্প নিজেই এ আইনের অনুমোদন না নেয়ার কথা অস্বীকার করেছেন।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই রায়ের ফলে অনেক বিশ্লেষকই মনে করেন, বৈশ্বিক ট্রেডে কিছু অস্থিতিশীলতা কমতে পারে, তবে পুরোপুরি নিশ্চিত নয়। নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের ল’ বিশেষজ্ঞ পিটার শেইন বলেছেন, ‘আদালত তাদের এটি দেখাতে চান যে, ট্রাম্পের সবকিছুই আইনি ভিত্তিতে নয়।’

নতুন শুল্কের ধরন কী

ট্রাম্প যে ১৫ শতাংশ শুল্ক নতুন করে আরোপ করেছেন, তা মূলত একটি অস্থায়ী আমদানি শুল্ক। এটি আগামী ২৪ ফেব্রুয়ারি রাত ১২টা ১ মিনিট থেকে কার্যকর হবে। হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে এই শুল্কের নথিতে স্বাক্ষর করার পর, বিষয়টি জনসাধারণের কাছে বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করা হয়। এক বিবৃতিতে জানানো হয়, ট্রাম্প ‘১৯৭৪ সালের বাণিজ্য আইনের ১২২ ধারার অধীনে এই অস্থায়ী শুল্ক আরোপের জন্য স্বাক্ষর করেছেন।’

আসলে ১৯৭৪ সালের এই আইনটি কি?

এই আইন মার্কিন কংগ্রেসের রিসার্চ সার্ভিসের মাধ্যমে আইনগত বিশ্লেষণ সহায়তা করে, যা জানায়, এই ধারাটি প্রেসিডেন্টকে অনুমতি দেয় যে, তিনি প্রয়োজনে কাজের আওতায় অস্থায়ী শুল্ক আরোপ করতে পারেন। তবে এই শুল্কের সময়সীমা নির্দিষ্ট করে বলা হয়েছে যে, এটি ১৫০ দিনের বেশি চলতে পারবে না এবং শুল্কের সর্বোচ্চ হার ১৫ শতাংশের বেশি হওয়া উচিত নয়।

কানাডা ও মেক্সিকো বাদ

হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, উত্তর আমেরিকার বাণিজ্য চুক্তির সাথে সামঞ্জস্য রক্ষায় কানাডা ও মেক্সিকো এই শুল্ক থেকে অব্যাহতি পেয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে গরুর মাংস, টমেটো এবং গুরুত্বপূর্ণ খনিজ পদার্থের মতো আমদানি পণ্যগুলোও।

বিচার বিভাগের সঙ্গে বিরোধ

সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পর, ট্রাম্প প্রশাসন ও বিচার বিভাগের মধ্যে দ্বৈত অবস্থান স্পষ্ট হয়েছে। ট্রাম্পের পক্ষে ষোলোটি বিচারপতি রুলের পক্ষে ভোট দিলেও, তিনজন বিরোধিতা করেন। যারা রুলের পক্ষে ছিলেন, তাদের মধ্যে তিনজনই তার দল রিপাবলিকান পার্টির মনোনীত।

বিবিসি বলেছে, এই রুল জারির ঘটনা ‘ভয়াবহ’ এবং ট্রাম্পের বাণিজ্যনীতিকে তিনি ‘অযোগ্য’ বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেন, এই সিদ্ধান্তের জন্য রুল জারির পক্ষে থাকা বিচারপতিদের তিনি ‘বেকুব’ বলে আখ্যায়িত করেন। এই আইনি লড়াই চালিয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত দিয়ে তিনি বলেন, ‘আমাদের বিকল্প রয়েছে এবং আরও শক্তিশালী বিকল্পও রয়েছে।’ পরে তিনি ঘোষণা করেন, ‘নতুন শুল্ক আরোপ করে তারা কিছু করলেন, কিন্তু আমাদের কাছে আরও ভালো সমাধান রয়েছে।’ বিরোধিতা করা তিনজন রিপাবলিকান বিচারপতিকে তিনি বলেন, ‘তাদের আমি খুব লজ্জিত, কারণ তাদের দেশপ্রেম এবং সংবিধানের প্রতি সম্মান নেই।’

সুপ্রিম কোর্টের এই রায়ের প্রভাব কী?

দ্য গার্ডিয়ান অনলাইন মনে করে, এই সিদ্ধান্ত মার্কিন ট্রেডনীতিতে একটা গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হলেও, এর মাধ্যমে বৈশ্বিক বাণিজ্যে স্থায়ী পরিবর্তন হবে না বা অস্থিরতা দূর হবে না। ব্রিটিশ চেম্বার অব কমার্সের ট্রেড এক্সপার্ট উইলিয়াম বাইন বলেন, ‘এই রুল প্রেসিডেন্টের ক্ষমতার ব্যাপারে কিছুটা স্পষ্টতা এনে দিলেও, এটি বহির্বিশ্বে বাণিজ্যের অবস্থা একেবারে বদলে দিতে পারেনি।’

পোস্টটি শেয়ার করুন